সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের বাসভবনের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ভুলবোঝাবুঝির অবসান

 উভয়পক্ষের দুঃখপ্রকাশ

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের নীলগঞ্জ সুপারি বাগান এলাকার বাসভবনের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং হট্টগোলের সুরাহা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সব পক্ষকে নিয়ে জেলা প্রশাসনের আহ্বানে এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে ঘটনার শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি ঘটে।

বৈঠক শেষে জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল পৃথক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

বৈঠক শেষে জেলা প্রশাসক আশেক হাসান জানান, স্থানীয় কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, এলাকাবাসী ও সংসদ সদস্যের পরিবারের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করা হয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং সকল অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

সংসদ সদস্যের মেয়ের মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক জানান, দীর্ঘ দিন ধরে চিকিৎসাধীন ওই তরুণীর হঠাৎ উদ্ভূত আচরণের বিষয়টি সব পক্ষ বিবেচনায় নিয়েছে এবং এলাকায় বর্তমানে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।

সভায় জেলা প্রশাসক ছাড়াও পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন উপস্থিত ছিলেন। সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল নিজে, মাদ্রাসা কতৃপক্ষ, বাড়িওয়ালাসহ সকল পক্ষের প্রতিনিধিরা প্রশাসনের এ সভায় উপস্থিত ছিলেন।

জেলা প্রশাসক জানান, মাদ্রাসার চাওয়া অনুযায়ী দুএকদিনের মধ্যে ওই সড়কে একটি স্প্রিড ব্রেকার তৈরি করা হবে। অভিভাবকদের বসার জন্য একটি শেড নির্মাণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আল-মাদ্রাসাতুশ শারইয়্যাহের মুতামিম মুফতি কবির হোসাইন বলেন, ওই বৈঠকে সংসদ সদস্য তার মেয়ের কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল, আমরাও দুঃখ প্রকাশ করছি।

মিমাংসা সভা শেষে কালেক্টরেট চত্বরে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল। তিনি বলেন, ‘একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকে প্রায় ১২ ঘণ্টা আমি বাসায় অবরুদ্ধ ছিলাম। আমার বাসায় কিছু উশৃঙ্খল যুবক, যারা ভাঙচুরও করেছে।

আমার বাসার সামনে একটি মাদ্রাসা আছে, মাদ্রাসাতুস শরীয়াহ, একটা মসজিদ আছে। এই মাদ্রাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমি অবদান রেখেছিলাম, মালিক কর্তৃপক্ষ সবকিছুই জানে। মাদ্রাসার বিভিন্নভাবে কালেকশন করে সহযোগিতা করা, মসজিদের এসি কিনে দেওয়ার মত সহযোগিতা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই করে আসছি, আমি সার্বিক সহযোগিতা করেছি, এলাকার সকল মানুষ সেটা জানে।

কিন্তু গতকাল যখন আমি অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, যেহেতু আমি নির্বাচিত এমপি, আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির, অসংখ্য মানুষ কিন্তু এখানে আসতে পারত। আমার কাছে হাজার হাজার মোবাইল ছিল। কিন্তু আমি কাউকে এখানে আসার অনুমতি দিইনি এই কারণে যে, আজকে যে জনগণ কে ভিন্ন মেসেজ দিয়ে, ভুল বুঝিয়ে এখানে আনা হয়েছে, আমি চাইনি তাদের সাথে আমাদের সাথে কোনো সংঘর্ষ হোক। তারা আমাদেরই ভোটার, এ দেশেরই জনগণ।

আমি জনগণের বিপক্ষে কোনো ভূমিকা নিতে চাইনি। এই কারণে আমি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমি ধৈর্য ধারণ করেছি এবং প্রশাসনের মাধ্যমে একটা সুরাহা হোক, আমি সেটাই চেয়েছি।

এতে হয়তো অনেকে অনেক কিছু বলতে পারে যে, আপনাদের এত বড় দল, পাঁচজন এমপি যশোরে, আপনারা কিছুই করলেন না কেন? কিন্তু আমি দেখলাম এখানে যদি আমাদের হাজার হাজার জনগণ চলে আসে, তাহলে এখানে এই সাধারণ জনগণের সাথে একটা হট্টগোল হবে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সাথে হট্টগোল হবে, এটা আমি কখনোই চাইনি। কারণ আমি তো কওমি মাদ্রাসার পক্ষে, মাদ্রাসায় ছাত্ররা পড়ুক এর পক্ষেই কিন্তু আমি আছি।

আমি জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করি। আমি কওমি মাদ্রাসার জন্য সংসদে তাদেরও সরকারি সুযোগ-সুবিধা তারা বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করুক, সে বক্তব্যও কিন্তু আমি দিয়েছি।’

তিনি এ ঘটনায় বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে জানান, ‘গতকালকের ঘটনায় আমাদের যশোরের মাননীয় মন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত আমার সাথে দুইবার কথা বলেছিলেন। প্রশাসনকে দিয়ে এবং তার কর্মীদেরকে দিয়েও এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা যে মব সৃষ্টি করা হয়েছিল, আমার বাসা ভাঙচুর করা হয়েছিল, তাদের নেতৃবৃন্দকে দিয়ে পরিবেশটা শান্ত করার তিনি চেষ্টা করেছেন। এজন্য আমি মাননীয় মন্ত্রীকেও ধন্যবাদ জানিয়েছি।’

প্রশাসনের মধ্যস্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকের মিটিংয়ে আমাদের জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার, আমাদের জেলা পরিষদের প্রশাসক ছিলেন, বিএনপির জেলা সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন খোকন, তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা সেটাই মেনে নিয়েছি। আমি সেখানে বলেছি যে, আমার কোনো ভুলত্রুটি যদি থাকে, তার জন্য আমি দুঃখিত এবং আমি মর্মাহত।

আমার মেয়েটা সাইকিয়াট্রিক রোগী, তার দ্বারা যদি কিছু ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তার জন্য আমি মর্মাহত ও দুঃখিত। এখানে যেটা ঘটনা ঘটছে, যে শালিস হয়েছে বা যেটা মীমাংসা হয়েছে, আমি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সে মীমাংসাটাকে মেনে নিয়ে আমি সেখান থেকে চলে আসছি। আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।’

মামলা করবেন কি না এ প্রশ্নের জবাবে সংসদ সদস্য বলেন ‘আমরা একটা অভিযোগ করেছি থানায় গতকাল। কারণ আমার মেয়েও তো আহত এবং আমার বাসায় আপনারা যেয়ে দেখেন, বাসার অনেকগুলো গ্লাস তারা ভেঙে দিয়েছে, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে, এমনকি ড্রিল মেশিন দিয়ে আমার বাসার গেট ভাঙার তারা চেষ্টা করেছিল। তবে আমি এ বিষয়গুলো ভুলে গেছি। তারা হয়তো ভুল বোঝার কারণে সেখানে গিয়েছে, তারা হয়তো আসলে প্রকৃতপক্ষে ঘটনাটা জানে না। আমি তাদেরকে ক্ষমা করি।

মামলার বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেছেন, তারা এটা বিবেচনা করবেন। যেহেতু উভয় পক্ষেরই অভিযোগ রয়েছে, সেটা তারা সুরাহা করবেন বলে আশা দিয়েছেন।’

এরআগে মঙ্গলবার যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনের সামনে হট্টগোল ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তার মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যার অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জের ধরে স্থানীয় কিছু জনতা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। তারা ১২ ঘণ্টা এমপিকে অবরূদ্ধ করে রাখে। তার বাড়িতেও ভাংচুর করে। গেট ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে।