জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, যুদ্ধ জিতলে লুটের মালে বিজয়ীরই অধিকার

0
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।। ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া এক বিস্ফোরক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফা সামরিক সিদ্ধান্ত, পররাজ্যের সম্পদ দখল এবং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার কথা খোলাখুলি ঘোষণা করেছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি সাফ জানান, যুদ্ধ জয় করলে পরাজিত দেশের সম্পদ বা ‘লুটের মালামাল’ লাভ করা বিজয়ী পক্ষেরই অধিকার।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এরপর এক নজিরবিহীন চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে ট্রাম্প কোনো দ্বিধা ছাড়াই সেই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির সরাসরি যোগসূত্র টেনে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে।

ট্রাম্পের এই অবস্থান বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির ঠিক বিপরীত। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল একতরফা শক্তি প্রয়োগ ও যুদ্ধ ঠেকানো।

জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা সরাসরি আত্মরক্ষা ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ। তবে ট্রাম্প এই নীতিকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও অর্থনৈতিক ফায়দাকেই সামরিক পদক্ষেপের মূল যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

একই ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমাকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে—ইরানের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেব।’ তিনি ইরানকে এমনভাবে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দেন যাতে তাদের টিকে থাকার কোনো আশা না থাকে।

এর আগে ২০১৭ সালে প্রথম ভাষণেও তিনি উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন। ৯ বছর পর এসে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিলেন, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপরই নির্ভর করে।

১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’ এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট থিয়োডোর রুজভেল্টের নীতিকে সম্প্রসারিত করে ট্রাম্প জানান, শুধু পশ্চিম গোলার্ধ নয়, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মার্কিন জাতীয় স্বার্থে একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন একাই নেবে।

এছাড়া ভাষণের অন্য অংশে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) ‘আমেরিকাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে তা ত্যাগের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রস্তাবিত কার্বন শুল্ক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রণের বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং ইউনেস্কোর নানা নীতির সরাসরি বিরোধিতা করেন তিনি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের ক্ষয়িষ্ণু সমর্থন সামাল দিতেই ট্রাম্পের এই কৌশল। রয়টার্স-ইপসসের সর্বশেষ জরিপে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। ঘরোয়া সমর্থকদের কাছে নিজেকে বিশ্বমঞ্চের একচ্ছত্র শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রদর্শন করতেই তিনি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কফিনে এই চরম পেরেক ঠুকলেন।