রাজগঞ্জের আতঙ্ক মন্টু চেয়ারম্যান ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী প্রকাশ্যে

0

 

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ অঞ্চলের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাইফুল ইসলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও তার অনুসারীরা অধরা রয়েছে। সাইফুলের ভাই ঝাঁপা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল হক মন্টু, আরেক ভাই রওশন জামান টুটুল ও তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বিগত এক যুগের অধিক সময় ধরে তারা ঝাঁপা ইউনিয়নসহ গোটা এলাকায় ত্রাস ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। রাজগঞ্জসহ গোটা এলাকা ছিল সন্ত্রাসীদের দখলে। এলাকাবাসী কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে তিন ভাই। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক, জুয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যায় তারা। এলাকাবাসীর অভিযোগ প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর আবারও সেই সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে এসেছে।
রাজগঞ্চ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গেল ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর সন্ত্রাসীরা কিছু দিন আত্মগোপনে যায়। প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তায় এরপর তারা আবারও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। তবে বেশ কিছু দিন আগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধান সাইফুল ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে। কিন্তু তার অনুসারীরা অধরায় থেকে যায়। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতা না থাকায় জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী জানান, পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ঝাঁপা ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের শামসুল হক মন্টু ও তার দুই ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম ও রওশন জামান টুটুলকে নিয়ে গড়ে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। বয়সে ছোট হয়েও সাইফুল ইসলামের হাতে ছিল ওই সন্ত্রাসী বাহিনীর নেতৃত্ব। এই সন্ত্রাসীর বাহিনীর সদস্য হিসেবে ছিল ঝাঁপা গ্রামের প্রয়াত নুর আলী খাঁর পুত্র হাফিজুর রহমান, খালিয়া গ্রামের আবুল কাশেম, চন্ডিপুর গ্রামের মাহবুবুর রহমান, চালুয়াহাটি ইউনিয়নের শফিকুল ইসলাম টুলু। এই বাহিনী দিয়ে চলতো তিন ভাইয়ের চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মাদক, জুয়া। এর মাধ্যমে তিন ভাই কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে বিএনপি নেতা সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আহমেদের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়ে শামসুল হক মন্টু ও তার দুই ভাই আরও ভংকর হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনের কিছুদিন পর মাহবুবুর রহমানের পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রম চালানোর জেরে রাজগঞ্জ অঞ্চলের আওয়ামী লীগ নেতা আবু আব্দুল্লাহ হত্যা হয়। এলাকাবসী জানে পথের কাটা সরাতে এ হত্যাকা- তিন ভাই ঘটিয়েছে। তবে আইনের ম্যারপেচে তারা হত্যার অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়। ।
২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে রাজগঞ্জ বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আলাউদ্দিন আহমেদকে হত্যা করতে যায় সাইফুল ইসলাম। স্থানীয় সংবাদ কর্মী ও বাজারের ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে সেদিন রক্ষা পান বিএনপি প্রার্থী আলাউদ্দিন আহমেদ। দখল দারিত্ব আর ভোট ডাকাতির সেই নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় শাসছুল হক মন্টু। কিন্ত শপথ পড়ানোর আগেই চন্ডিপুর ও রামনাথপুরের মাঠে হিন্দু সম্প্রদায়ের শ শ বিঘা জমি দখল করেন। যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিছুর রহমানের দৃঢ়তায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মন্টুর রাহু গ্রাস থেকে মুক্তি পায়। সে সময় মন্টু চেয়ারম্যানকে ধরিয়ে দিতে রাজগঞ্জ বাজারে মাইকিং করে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা দেন পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান। স্থানীয় সংসদ স্বপন ভট্টাচার্য্যের আর্শিবাদে সে যাত্রায় শাসমুল হক মন্টু, তার দুই ভাই মুক্তি পেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভের পর গোটা ইউনিয়নবাসীর কাছে মুর্তিমান আতঙ্কের এক নাম হয়ে ওঠে শামসুল হক মন্টু। শালিসের নামে সাধারন মানুষকে মারপিট করার মত ন্যাক্কার জনক ঘটনার জন্ম দিয়ে একাধিকবার আলোচনায় আসে শেখ হাসিনার দোসর শামসুল হক মন্টু। এছাড়া ঝাঁপা গ্রামে তার অনুসারী হাফিজুর রহমান (ন্যাদা) কে দিয়ে ভুমিহীনদের বাড়ি দেবার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। ঠিক একইভাবে তার অন্যান্যা গ্রামের অনুসারীদের দিয়ে ভুমিহীনদের বাড়ি দেয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনিভাবে টিউবওয়েল, বিভিন্ন ভাতা প্রদানসহ ইউনিয়নের পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
বড় ভাইয়ের মত ওপর দুই ভাই সাইফুল ইসলাম ও রওশন জামান টুটুল সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে চাঁদাবাজি, দখল দারিত্ব, মাদক , জুয়ার মাধ্যমে কোটি টাকার মালিক বনে যায়। সাইফুল ইসলাম ও রওশন জামান টুটুল চন্ডিপুর ও খালিয়া গ্রামে শ শ বিঘা ঘের দখল করে মাছ চাষ করে। এছাড়া গ্রাম্য শালিসসহ নানা বিষয় সাধারণ মানুষকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে টাকা অর্থ আদায় করাই ছিল তাদের নেশা। চন্ডিপুর গ্রামে জুয়ার বোর্ডের মাধ্যমে টাকা হাতানো ছিল তাদের অন্যতম অবৈধ আয়ের উৎস।
ষোলাখাদা গ্রামের আবুল ইসলাম বলেন, ‘এমন কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম নেই যা মন্টু ও তার দুই ভাই সাইফুল ও টুটুল করেনি। আমরা সাধারণ মানুষ সন্ত্রাসী তিন ভাইয়ের হাতে জিম্মি ছিলাম। কথা বললেই প্রাণের নাশের হুমকি দিতো। শেখ হাসিনার পতনের পর কেন সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না প্রশাসনের কাছে এর জবাব চাই। অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে।’
ঝাঁপা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, যেহেতু তারা এক যুগের অধিক সময় ধরে এলাকায় সন্ত্রাসীর রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরও তাদের আটক না করায় তারা প্রকাশ্যে এসেছে। পুর্বের মত তারা আবারও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করবে না এর কি নিশ্চয়তা আছে। যে কারণে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করেছে।
কেন এই সন্ত্রাসীদের আটক করা হচ্ছে এমন প্রশ্নে মনিরামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) পলাশ কুমার বিশ্বাস বলেন, তাদের আটকের ব্যাপারে আমাদের তৎপরতা আছে। বিগত দিনে আওয়ামী লীগের যে সকল নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দখল দারিত্বসহ নানা অপারধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল তাদের আটকের জন্য আমরা তৎপর আছি। পূর্বে যারা মনিরামপুর থানায় দায়িত্ব ছিল তারা অধিকাংশ অন্যত্র বদলি গেছে, সন্ত্রাসীদের চিনতে নতুনদের একটু সময় লাগছে। বিভিন্ন সময় যারা জনপ্রতিনিধি ছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর তাদের আটকের জন্য অভিযান চালানো হয়েছে তারা আত্মগোপনে আছে।