জুলাই স্মৃতি: যশোরে অবহেলায় পড়ে আছে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ 

0
ছবি: লোকসমাজ।

তহীদ মনি ॥ শুরু হয়েছে জুলাই মাস। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের স্মারক এই মাস। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

তবে সেই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে যশোরে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ আজ অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলেও যশোর শহরের বকুলতলায় নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির বর্তমান অবস্থা হতাশাজনক।

স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, ভাঙাচোরা বেষ্টনী এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন।

আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ ও গুন্ডা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও সহিংসতার নানা ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।

এই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে যশোর শহরের কালেক্টরেট ভবনের বাইরে বকুলতলা এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি অবহেলার শিকার হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। বাঁশের তৈরি ঘেরাওয়ের অনেক অংশ ক্ষয়ে গেছে। স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশ অপরিচ্ছন্ন। স্থাপনার পরিচিতিফলকে খোদাই করা অনেক অক্ষরও মুছে যেতে শুরু করেছে। চারপাশে যানবাহন পার্কিংয়ের কারণে পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন যশোরে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা রাশেদ খান। তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের অনেক অর্জন ও অপূর্ণতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু অন্তত স্মৃতিস্তম্ভটিকে সম্মান জানিয়ে আমরা যারা জীবন দিয়েছেন ও আহত হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারতাম। এটি আমাদের অর্জনের প্রতীক। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি।”

স্মৃতিস্তম্ভের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে যশোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “সে সময় ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। শুধু বিদ্যুতের সংযোগ ও আলোকসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের দায়িত্ব পৌরস-ভার।”

অন্যদিকে যশোর পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসান বলেন, “স্মৃতিস্তম্ভ এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন কারণে এতদিন কাজ শুরু করা যায়নি। তবে চলতি মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত এই স্থাপনাটি যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সম্মানজনক অবস্থানে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের স্মারক হিসেবে স্মৃতিস্তম্ভটির সংরক্ষণ শুধু একটি স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ নয়, বরং একটি সময়ের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও বিষয়।