যশোর-৩ আসন : সাধারণ মানুষের ভোট ভাবনায় অনাগ্রহ, গ্রামাঞ্চলে নেই নির্বাচনের আমেজ

0

মাসুদ রানা বাবু॥ যশোর শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মালঞ্চি বাজার। সিভিল কোর্ট মোড় হয়ে মুজিব সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত সড়কের দু-ধারে বেশ কিছু পোস্টার ঝুলতে দেখা যায়। ঝুলতে থাকা পোস্টারের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে বেশি আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাজী নাবিল আহমেদের নৌকার পোস্টার। বাকিটা তারই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহিত কুমার নাথের।
মালঞ্চি বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে বসে কথা হয় কৃষক ওসমান আলীর সাথে। নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি মুচকি হেসে বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। ভোটের মাঠে না গেলিও আমার ভোট হয়ে যায়। এখান থেকে দুইজন নির্বাচন করছে। একজন নৌকা মার্কায়, আরেকজন ঈগল মার্কায়। আমার কাছে এখনো কেউ ভোট চায়নি। আমার ভোটের দরকার হয় না, এজন্যি আমার কাছে কেউ ভোট চায়নি।
ভোটের পরিবেশ কেমন-একথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোটের আমেজ নেই। আগের ভোটের সময় আমরা কত আমেজ করেছি। ও রকম ভোট আর হবে না। ভোটের মাঠে দুইপক্ষ সমান না হলি ভোটের মাঠ জমে না। তিনি বলেন, ভোটের মাঠে যাওয়ার কোন ইচ্ছে নেই।
কৃষক ওসমান আলীর কথার সূত্র ধরে চা দোকানি বাবুল হোসেনও চা বানানো বাদ দিয়ে ভোট নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। তিনি বলেন,আমার বাড়ির পাশে ভোট কেন্দ্র। গেলবার ভোটের মাঠে যাইয়ে শুনি আমার ভোট হয়ে গেছে। এবারও যদি ও রকম ভোট হয়, তাহলে ঘরতেই বেরোবো না। নিজেরা-নিজেরা নির্বাচন করছে- এটা আবার কিরকম কথা? কৃষক ওসমান আলীর মত তিনিও সঠিক বলতে পারেন না কতজন নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, নৌকা মার্কায় নাবিল ও ঈগল মার্কায় আওয়ামী লীগের (সদর উপজেলা) সভাপতি মোহিত নাথ দাঁড়াইছে। জাতীয় পার্টি থেকে আরেকজন দাঁড়াইছে। উনি উকিল সাহেব। নামটা মনে নেই।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যশোর-৩ (সদর) আসনের সাধারণ ভোটার ওসমান আলী এবং বাবুল হোসেন এভাবে তাদের অভিমত ব্যক্ত করছিলেন। যশোরের ৬টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসন এটি। এ আসনে কতজন প্রার্থী সেটিও সিংহভাগ ভোটার জানেন না।
মালঞ্চি বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নতুনহাট বাজারে গিয়ে কথা হয় রিপন হোসেনের সাথে। রিপন হোসেন পেশায় একজন শ্রমিক। নির্বাচন নিয়ে কথা বলতেই অনেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমি ভোটের মাঠে যাব না। সারাদিন কাম-কাজ করে যা পাই তা দিয়ে বর্তমান বাজারে ঠিকমতো সংসার চলে না। নির্বাচন নিয়ে আমার ভাবতি গেলি চলবে না। আগেরবার আমার ভোট দিতি দেয়নি।
তবে তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে বলেন,ওই নির্বাচনের পর আর কোন নির্বাচনে আমেজ দেখিনি।
নতুনহাট থেকে আবার মালঞ্চি ফিরে এসে তেঘরিয়ার ভেতর দিয়ে কিছুটা ভাঙাচোরা পিচের ও বাকিটা সোলিং রাস্তা বেয়ে এড়েন্দা বাজারে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে কথা হয় যুবক সোহেল হাসানের সাথে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে লেখাপড়া শেষ করেছি। অনেক চেষ্টা করেও কোন চাকরি না পেয়ে কৃষিকাজ করছি। নির্বাচন নিয়ে ভাবতে গেলে আমার চলবে না। আমার হিসেবে এটা কোন নির্বাচন না। পরপর দুইটি নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি। নাগরিক হিসেবে জানতে ইচ্ছা করে ভোট দেয়ার অধিকার আমার আছে? পরপর দুটি নির্বাচনে যখন ভোট দিতে পারলাম না, এবার ভোট দিতে পারবো- তার কী নিশ্চয়তা আছে? তিনি বলেন, আমি যতটুকু বুঝি ভোটের মাঠে প্রধান দুইপক্ষ না থাকলে,ভোট জমে না। বাংলাদেশে বড় দুটি দল বলতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে বোঝায়। এই দুটি দল ছাড়া নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কিংবা অর্থবহ কোনটিই হয় না।
এরপর এড়েন্দা বাজারে এসে কথা হয় আতিয়ার সরদার নামের এক ব্যবসায়ীর সাথে। ভোটের কথা বলতেই ২০১৮ সালে ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে বলেন, আমি সরাসরি কোন দল করিনে। তবে আওয়ামী লীগে ভোট দেই। গেলবার আমার ভোটটাও আমি দিতে পারিনি। সে ক্ষোভে আমি এবার ভোটের মাঠে যাব না। আমি ধান -চালের ব্যবসা করি, গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে বেড়াই। নির্বাচনের কোন আমেজ নেই।
এড়েন্দা থেকে ছুটিপুর সড়ক বেয়ে যশোরে আসার পথে সুজলপুর বাজারের পাশে নৌকার প্রার্থীর একটি অফিস চোখে পড়ে। ডেকরেশনের কাপড় আর নৌকার পোস্টার দিয়ে অফিসটি সাজানো। অফিসে টেবিল- চেয়ার পড়ে থাকলেও কোন লোকজন নেই । অফিসের সামনে দাঁড়াতেই পাশে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল বারিক বলেন, এখন কেউ আসবে না। সন্ধ্যার দিকে আসলে লোকজন পাওয়া যাবেনে ।
নির্বাচন নিয়ে কথা হয় যশোর শহরের খড়কি গাজীর বাজার এলাকার গৃহবধূ রোজিনা আক্তারের সাথে। তিনি বলেন, ৭ জানুয়ারি নির্বাচন এটা জানি। কিন্তু ভোট নিয়ে আমার মধ্যে আগ্রহ নেই। কারণ এই ভোটে কোন উৎসব আমেজ নেই। এমন নীরব ভোট এর আগে কখনো দেখিনি।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর উপজেলার একজন স্কুল শিক্ষিকা বলেন, আমি নির্বাচন নিয়ে বেশ শঙ্কিত- চিন্তিত। গেল ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ভীতিকর পরিস্থির শিকার হয়েছিলাম। এবার নির্বাচনেও দায়িত্ব পালন নিয়ে কেবল আমি শুধু না, আমার পরিবারও শঙ্কিত।
যশোর-৩ (সদর) আসনে নির্বাচনী এলাকায় কেবলমাত্র নৌকা ও স্বতন্ত্রপ্রার্থীর পোস্টার দেখা যায়। অথচ এই আসন থেকে মোট আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হচ্ছেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত কাজী নাবিল আহমেদ, একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথ, জাতীয় পার্টি থেকে মাহবুব আলম বাচ্চু, বিকল্পধারা বাংলাদেশ থেকে মারুফ হাসান কাজল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে মোহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান, তৃণমূল বিএনপি থেকে কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে শেখ নুরুজ্জামান ও ন্যাশনাল পিপল্স পার্টি থেকে সুমন কুমার রায়।
সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও (বসুন্দিয়া বাদে) একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত সদর আসন। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৭। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯২ হাজার ৯৪৭।মহিলা ভোটার ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৮৪। এছাড়া ৬ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।