যশোর হাসপাতালের কর্মচারীরাও দালালি পেশায় যুক্ত, হাতিয়ে নিচ্ছে রোগীদের অর্থ

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের পাশাপাশি যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কর্মচারীরাও দালালির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসার নামে তারা অসহায় রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। ফলে কে বহিরাগত দালাল আর কে হাসপাতালের নিজস্ব কর্মী, তা বুঝে ওঠা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার সকাল ১০টায়। হাসপাতালের ১২২ নম্বর বহির্বিভাগের চেম্বারের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওয়ার্ড বয় মো. মোখলেছুর রহমান। এ সময় মনিরামপুর উপজেলার জয়পুর গ্রামের গৃহপরিচারিকা ফাতেমা খাতুন (৩০) কিড

ফাতেমা বেগম

নি রোগে আক্রান্ত তার ১৮ বছর বয়সী ছেলে সোহানকে নিয়ে সেখানে আসেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে চিকিৎসা সনদ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মোখলেছুর রহমান চার মাস আগে ফাতেমার কাছ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা নেন। সনদপত্রের জন্য তাকে বারবার মনিরামপুর থেকে যশোর সদরে আসতে হতো। প্রতিবার যাতায়াতে তার খরচ হতো ২৪০ টাকা। কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফাতেমা যশোর শহরের বারান্দিপাড়ায় নিজ বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে হাসপাতালে যাতায়াত শুরু করেন।

দীর্ঘ চার মাস ধরে ঘোরাঘুরির পরও যখন সনদপত্র পাচ্ছিলেন না, তখন ফাতেমা খাতুন বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। ঘটনাটি জানার পর আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) শালিস ডেকে মোখলেছুর রহমানকে টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২৭ জুলাই মোখলেছুর রহমান ১ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত দেন এবং বাকি থাকে ৩০০ টাকা। ২৮ জুলাই ফাতেমা খাতুন বাকি টাকার জন্য এলে হাসপাতালের টহলরত পুলিশ সদস্য জুয়েল হোসেন অনৈতিকভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগে মোখলেছুর রহমানকে হাতেনাতে ধরেন। পুলিশ মোখলেছুর ও ফাতেমাকে তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয়ে নিয়ে যায়।

ওয়াট বয় মোঃ মোখলেসুর রহমান।

সেখানে কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সামনে মোখলেছুর রহমান হাত-পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না বলে অঙ্গীকার করলে শেষ পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কেবল মোখলেছুর রহমানই নন, হাসপাতালের অনেক কর্মচারীই চাকরির পাশাপাশি অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য রোগীদের বিভ্রান্ত করে দালালির পথ বেছে নিয়েছেন, যা সরকারি চাকরিবিধির চরম লঙ্ঘন।

অন্যদিকে, হাসপাতালের সামনে কতিপয় অখ্যাত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকেরা কমিশন ভিত্তিতে নারী ও পুরুষ দালাল দিয়ে রোগী ভাগানোর কাজ করাচ্ছেন। বিষয়টি নজরে এলেও এবং একাধিকবার ধরা পড়লেও যশোর সিভিল সার্জন অফিস এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনেকেই স্বাস্থ্যবিধির কোনো শর্তই মানে না। গত ২৭ জুলাই (সোমবার) যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন ২ হাজার ২৪০ জন রোগী (পুরুষ ৮২০, নারী ৬৭০ এবং শিশু ৭৫০ জন)। একই সঙ্গে হাসপাতালের অন্তর্বিভাগে ভর্তি ছিলেন ৭০১ জন রোগী।

বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে প্যাথলজি, আল্ট্রাসোনো ও এক্স-রে বিভাগে দিনে পরীক্ষার সংখ্যা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগায় দালালচক্র। তারা পরীক্ষা না করাতে পারা রোগীদের ফুসলিয়ে অখ্যাত ডায়াগনস্টিকগুলোতে নিয়ে নামমাত্র পরীক্ষার নামে শত শত টাকা হাতিয়ে নেয়।

গত ২৬ জুলাই ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত ‘ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার’-এ রাজিয়া (৪০) নামের এক রোগীর রক্ত পরীক্ষার নামে ১ হাজার ২০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। অথচ এসব রিপোর্টের মান নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন ওঠে এবং হাসপাতালের চিকিৎসকেরা অনেক সময়ই তা গ্রহণ করেন না। ফলে রোগীদের পুনরায় বড় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়।

জানা গেছে, প্রায় অর্ধশতাধিক নারী ও পুরুষ দালাল হাসপাতাল ঘিরে সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কমিশন পেয়ে থাকে।

রাজিয়া নামের ওই রোগীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের ব্যবস্থাপক খাইরুজ্জামান বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো দালাল নেই। রাজিয়াকে কে এনেছিল তা আমার জানা নেই।”

হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে আরএমও ডা. আহসান কবির বাপ্পি জানান, “হাসপাতাল থেকে দালাল পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। প্রশাসন যদি আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবেই কেবল দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা সম্ভব।”

বিষয়টি নিয়ে সিভিল সার্জন ডা. মো. রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমরা তো সরাসরি নিজস্ব কোনো মোবাইল কোর্ট বা পুলিশি ব্যবস্থা নিতে পারি না। বিষয়টি জেলা প্রশাসক (ডিসি) অথবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) অবহিত করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।”