যশোরে কথিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের পর হয়রানি ছাড়াই সেবা পাচ্ছেন পৌরবাসী

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের প্রহসনের নির্বাচনে দলীয় মনোনীত মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণের পর যশোর পৌরসভায় কর্মচাঞ্চল্যতা ফিরেছে। পৌরবাসী এখন কোনো হয়রানি ছাড়াই পাচ্ছে নাগরিক সেবা। অন্যদিকে পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে পৌরবাসীর সেবা দিচ্ছেন।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ১৮ আগস্ট উন্নয়নবঞ্চিত পৌরবাসীর রোষানলে পড়ে পৌর ভবন থেকে পালিয়ে যান মেয়র হায়দার গণী খান পলাশ। পরদিন ১৯ আগস্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র এবং উপজেলা চেয়ারম্যানদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এরপর যশোরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসানকে পৌরসভার প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
পৌরসভার একটি সূত্র থেকে জানা যায়, রফিকুল হাসান প্রশাসক হিসেবে যোগদারেন পর ২৯ আগস্ট পৌর ভবনে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পৌরবাসীর বিবদমান সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে দেওয়া হয় ১০০ দিনের কর্মসূচি। কর্মসূচির মধ্যে ছিল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, যানজট, পয়ঃনিষ্কাশন, সড়ক বাতি, টাওয়ার লাইট স্থাপন, কসাই খানা নির্মাণ, ভবনের নকশা অনুমোদন, পৌর কর্মচারীদের অবসর ভাতা প্রদান ।
এরপর থেকে পৌর এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে চালানো হয় অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান। পতিত স্বৈরাচারের অনুসারী কিংবা তাদের দোসরদের দীর্ঘ দিন ধরে দখল করে রাখা অবৈধ স্থাপনাও সেই অভিযানে উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া শহরের যানজট নিরসনে দড়াটানা, পালবাড়ি মোড়, মণিহারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটপাত দখল মুক্ত করার লক্ষ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। তবে এ সকল স্থানে অভিযান চালানো হলেও আবার অনেক স্থানে দখল হয়ে গেছে, বিশেষ করে দড়াটানা সদর হাসপাতাল মোড়।
দড়াটানা ব্রিজ থেকে শুরু করে কাঠেরপুল ব্রিজ পর্যন্ত ভৈরব নদের পাশে অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সেখানে ওয়াকওয়ে নির্মাণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কাঠেরপুল ব্রিজের পাশে পৌরসভার নিজস্ব স্থানে কসাই খানা নির্মাণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন আছে। এছাড়া দিনের আলোকিত পৌরসভার নামে কথিত জনপ্রতিনিধিরা লাখ লাখ টাকা লোপাট করে। বিভিন্ন সড়কের অধিকাংশ সড়ক বাতিগুলো নষ্ট ছিল। নষ্ট সড়ক বাতিগুলো অপসারণ করে নতুন বাতি লাগিয়ে আলোকিত করা হয়েছে পৌরসভাকে। এর পাশাপাশি দড়াটানা, খুলনা বাসস্ট্যান্ডসহ শহরের প্রবেশ পথ পালবাড়ি, মুড়লী, চাঁচড়া চেকপোস্ট মোড় টাওয়ার লাইট স্থাপনের উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়। এরমধ্যে প্রথম ধাপে দড়াটানা এবং খুলনা বাসস্ট্যান্ডে টাওয়ার লাইট স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
শহরের জলাবদ্ধতা নিরসণের লক্ষ্যে নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করাসহ পালবাড়ী থেকে চাঁচড়া মোড় পর্যন্ত খাল খনন করা হয়েছে। খড়কি পীর বাড়ি এবং শংকরপুর এলাকার ব্যাপক জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে পানি নিষ্কাশনের বিকল্প হিসেবে পাইপ বসানো হয়েছে।
এছাড়া বাড়ি নকশা অনুমোদনে আটকে থাকা ২৭১ টি বাড়ির নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাড়ির নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিগত দিনে পৌরবাসীর মারাত্মক হয়রানি কিংবা প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের মাধ্যমে পৌরসভাকে ময়লা ও দুর্গন্ধমুক্ত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কাজ করছে।
এদিকে পৌরসভার আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত দিনে পৌরসভার বিভিন্ন পর্যায়ের ৪৫ জন কর্মচারীর অবসরকালীন টাকা আটকে ছিল। প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতোমধ্যে ৭ জনের অবসরকালীন টাকা প্রদান করা হয়েছে।
পৌরসভার ৯ টি ওয়ার্ডের জন্য ৯টি অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া প্রশাসক রফিকুল হাসান নিজেই অনলাইনে পৌরবাসীর সমস্যা জানানো জন্য একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছেন। সেখানে পৌরবাসী অনলাইনে তাদের অভিযোগ জানাতে পারবে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১২ টায় পৌর ভবনে সেবা গ্রহীতা পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের শংকরপুরের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন মিলনের সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এখন সেবা নিতে পারছি। প্রশাসক নিয়োগের আগে পৌরসভায় সেবা নিতে আসলে জনপ্রতিনিধিদের পেছনে ধরনা দিতে হতো। এখন সেখান থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি। তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ দিলেই পৌর কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত সমাধানের জন্য কাজ করছে। এবারের বর্ষা মৌসুমে আমার এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। যেটি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বছরের পর বছর ধরেও সমাধান করতে পারেনি।
অপর সেবা গ্রহীতা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের তাজরিন বেগম বলেন, আগে একটা জন্ম সনদের স্বাক্ষরের জন্য হয় কাউন্সিলরের বাড়ি কিংবা তার অফিসে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছে। এখন সেখান থেকে পরিত্রাণ পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা আমরা পৌরবাসী হয়রানির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি।
এ বিষয় যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কু-ু বলেন, প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে আমাদের কাজে কোনো বাধা নেই। উন্মুক্তভাবে নিয়ম কানুনের মধ্য দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যভাবে পৌরবাসীকে সেবা দিতে পারছি।
এ বিষয়ে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান দৈনিক লোকসমাজকে বলেন, আপনারাই তদন্ত করলে জানতে পারবেন কেমন সেবা দিচ্ছি। জনগণের কাঙ্খিত সেবা দেওয়ার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করছি। যেখানে আইনগত জটিলতা কিংবা অনেক অর্থের প্রয়োজন আছে সেক্ষেত্রে আমরা ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা তৈরি করে বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেই অনুযায়ী ওয়ার্ডে উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করবো। পৌরবাসী কোনো বিষয়ে আবেদন করলে সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। বিগত ৫ থেকে ৬ বছরের অনেক আবেদন পত্র নিয়ে এখনো সেবা প্রত্যাশীরা ঘুরে বেড়ায়। সেগুলো সমাধানের জন্য কাজ করছি। পজেটিভ কিছু করার দরকার নেই পারলে আমার ভুল ত্রুটি নিয়ে নিউজ করবেন। কারণ আমার ভুল ত্রুটি ধরতে না পারলে আমি কিভাবে সমাধান করবো। তাছাড়া আমার মধ্যে সমালোচনার সহ্য করার মানসিকতা না থাকলে আমি কিভাবে পৌরবাসীকে সেবা দেব?