মোবাইল ফোন আসক্তি: কতটা ঝুঁকিতে আমাদের শিশুরা

0

 

হাসান আল বান্না ।। আমরা সবাই জানি আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য, স্বাস্থ্যখাতে সব দেশের সব পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে এই শিশুরাই। কিন্তু আমরা কি খুব গভীরভাবে ভাবছি, যে এই শিশুরা নেতৃত্ব দেয়ার মত উপযুক্ত হয়ে বেড়ে উঠছে কিনা? তারা ঠিকভাবে কথা বলছে কিনা, সময় মত ঘুমাচ্ছে কিনা? ঘুম থেকে যথা সময়ে উঠছে কিনা। আমরা ছোট্ট বেলায় যেভাবে খেলাধুলা করতে পেরেছি, এরা এখন সেই সুযোগ পাচ্ছে কিনা? এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তরগুলো যদি আমাদের সামনে দৃশ্যমান করা হয় তাহলে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারবো পরিস্থিতি ভয়াবহ। অর্থাৎ আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য ভালো খবর নেই। যদি প্রশ্ন করা হয় আমাদের এই প্রজন্মের শিশুদের প্রধান সঙ্গী কে বা কী। মোটামুটি অধিকাংশের উত্তর আসবে মোবাইল ফোন। অনেকে বাধ্য হয়ে আবার কেউ কেউ স্বে”ছায় মোবাইল ফোন দিয়ে রাখি বা”চাদেরকে।
এবার ঢাকার একটি শিশু সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। সাভারের আমিন বাজার সংলগ্ন কাউন্দিয়া ইউনিয়ন।
এখানকার বাসিন্দা শিশু শ্রেণিতে পড়ুয়া ইয়ামিন ভালো ছাত্র। খুবই মেধাবী, নানা বাড়িতে থেকে লেখা পড়া করেন স্থানীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ঘরে তার সমবয়সী কেউ নেই, বাইরে নিয়মিত ঘুরাঘুরি করার সঙ্গও পাচ্ছে না সে, তবে তিনি একবারে নিঃসঙ্গ নন, নানুর ইন্টারনেট সংযুক্তমোবাইল তার প্রকৃত সঙ্গী। প্রায় দুবছর ধরে সে মোবাইল ব্যবহার করছে, আসক্ত এতোটাই বেড়েছে যে, এখন মোবাইল ছাড়া আর কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই তার। সময় কাটানোর প্রধান তার মোবাইল। লেখা পড়া সময় মোবাইল থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও ভাত খাওয়াতে হলে মোবাইল এর বিকল্প নেই। এ পরিস্থিতিতে ইয়ামিনের অভিভাবকরা শুধু বিরক্তই নন, বেশ টেনশনেও আছেন। এই ছোট্ট বয়সে এই আসক্তি হলে বড় হয়ে তার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। দেশজুড়ে প্রায় বাসায়ই এমন ইয়ামিনদের অবস্থান রয়েছে। ঘরে টেলিভিশন থাকার পরও বা”চারা মোবাইল ফোনেই বেশি আগ্রহী, এতে শারীরিক ও মানসিক নানা ঝুঁকি রয়েছে বলেও মনে করছে চিকিৎসক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।
শিশুরা আগামী দিনে দেশ চালানো, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিবে। কিন্তু শিশুকে সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠার যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজে অসচেতনভাবে বা শিশুদের জন্য কতটুকু সঠিক সেইসব বিষয়ে তেমন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই কোমলমতি শিশুদের গড়ে তোলা হয়। শিশুদের ব্যাপারে পিতামাতার আচরণও থাকে উদাসীন। যা একটি শিশুর সুস্থ’ ও স্বাভাবিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায়। আধুনিকতার নামে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে ওপর কুপ্রভাব পড়ে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে অনেক অভিভাবকই। মোবাইল ফোন এর মধ্যে অন্যতম। ফলে অনেক শিশু এখন আর খেলাধুলা অভ্যস্ত না হয়ে বাড়িতে, বাগানে ও মাঠে-ঘাটে অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গায় মোবাইলের মাধ্যমে গেম খেলাসহ নানা ধরনের আসক্তিমূলক সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। যা শিশুদের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি শিশু এক বেলা না খেয়ে থাকতে পারলেও মোবাইল ছাড়া একমিনিটও থাকতে পারেনা। অধিকাংশ পিতা-মাতা তাদের শিশুদেরকে মোবাইলফোনে আসক্তি থেকে বিরত রাখার চেষ্টা না করে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে এটাকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কিন্তু মোবাইল ফোনে আসক্তি তাদের শিশুদের জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হতে পারে, তা তারা উপলব্ধি করতে পারে না বা করে না।
স্কুল থেকে ফিরেই স্মার্ট ফোন-ট্যাব অথবা ল্যাপটপে ডুবে থাকছে শিশু-কিশোররা। বয়সসীমার ফাঁক গলে কখনও নিজেই অ্যাকাউন্ট খুলছে। আবার কখনও অভিভাবকের অ্যাকাউন্ট থেকে ঢুকে পড়ছে যেকোনো সাইটে। ইন্টারনেটে কতটা বুঁদ হয়ে থাকছে শিশুরা তা একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়বে। কখনও ইউটিউব, কখনও ফেসবুক, কখনও টিকটক-লাইকিতে মেতে আছে শিশুরা। এমন বাস্তবতাই এখন ঘরে ঘরে। কোভিডের ঘরবন্দি সময়ে শিশুদের নেট আসক্তি বেড়েছে কয়েক গুণ। অভিভাবকরা বলছেন, মোবাইল ছাড়া বা”চারা খেতে চায় না, ঘুমাতে যেতেও বায়না ধরে, স্কুলে না যাওয়ার ভয়ও দেখায়। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের ব্লাকমেইল করার চেষ্টা করে বা”চারা।
লিডস বেকেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি নতুন গবেষণায় ১১-১৮ বছর বয়সী ৫৯৪ জন শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোন ব্যবহার পরীক্ষা করা হয়েছে। বেশিরভাগই বলেছে যে, তারা পারিবারিক খাবারের সময়, বাড়ির কাজ করার সময় এবং এমনকি স্কুলের পাঠের সময় নিয়মিত তাদের ফোন চেক করে। যেখানে ৯৬% বলেছে যে তারা প্রতি দুই মিনিটে তাদের ফোন চেক করেছে, ৮৫% বলেছে যে তারা দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা অনলাইনে কাটায়। দুই তৃতীয়াংশ বলেছে যে তারা মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তির কারণে রাতে দুই থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতে পারে। প্রায় সকলেই (৯৮%) বলেছে যে তাদের ফোন বন্ধ করা হলে তারা সামলাতে লড়াই করবে। কেউ কেউ স্বীকার করেছে যে তাদের ফোন ছাড়া থাকা তাদের চরম উদ্বেগের কারণ হতে পারে এবং এমনকি শারীরিক সংঘর্ষের দিকেও যেতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, আমাদের শরীরে সেল ফোন বিকিরণের প্রভাব সম্পর্কে অনেক জল্পনা-কল্পনা চলছে। দ্য জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের একটি সমীক্ষা বিতর্ককে আলোড়িত করেছিল, যখন এটি মোবাইল ফোনের মস্তিষ্কের কার্যকলাপে প্রভাব ফেলতে পারে তা তদন্ত করে। মোবাইল ফোনের কারণে শিশুদের কি কি স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকতে পারে এই বিষয়ে ডাক্তারি পর্যালোচনা করেছেন ডা. নেহা ভাভে সালঙ্কার, (যিনি ভারতের নাগপুরের ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথের একজন পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) এবং মিসেস দীপল মেহতা, (যিনি ভারতের মুম্বাই এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি, পিজি ডিপ্লোমা ইন গাইডেন্স অ্যান্ড কাউন্সেলিংয়ের মনোবিজ্ঞানী)। তারা শিশুদের উপর মোবাইল ফোনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে বলেন, মোবাইল ফোনে আসক্তির কারণে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের রোগ বা সমস্যা হতে পারে। যেমন : (ক) নন-ম্যালিগন্যান্ট টিউমার: গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাদের মস্তিষ্ক ও কানে নন-ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্ত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদেরকে মোবাইল ফোন থেকে দূরে রাখতে হবে। কোনো ভাবেই শিশুদেরকে মোবাইল ফোনে আসক্ত হতে দেয়া যাবে না। তাদের নিকট মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত করতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদেরকে পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ করে দিতে হবে। শিশুদেরকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া উচিত, এতে তাদের মন প্রফুল্ল থাকবে এবং নানা বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি হবে। ফলে তাদের মেধা বিকশিত হবে, ভালো থাকবে শরীরও। (লেখক: সাংবাদিক)

Lab Scan