নীল বারুদের বিস্ফোরণ বনাম লাল নদীর মহাকাব্য: ডালাসের শেষ মঞ্চে কার জয়?

0
একপাশে নীল আগুন, অন্যপাশে শান্ত নদী; ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর 'ফাইনালের আগেই ফাইনাল' ।। ছবি: এআই/লোকসমাজ
ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের কৃত্রিম বাতাস আজ টেক্সাসের জুলাইয়ের তপ্ত হলকাকে গ্যালারিতে প্রবেশ করতে দেবে না ঠিকই, তবে মাঠের চর্তুদিকে যে আদিম ফুটবলীয় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়বে, তা নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য কোনো প্রযুক্তির নেই।
বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় ফুটবলবিশ্ব সাক্ষী হতে যাচ্ছে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের। একে শুধু সেমিফাইনাল বললে ভুল হবে, ফুটবলীয় মহিমায় এটি আসলে শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

একপাশে নীল রঙের এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, অন্যপাশে লালের এক চিরন্তন আভিজাত্য। একদিকে বারুদের তীব্র বিস্ফোরণ, অন্যদিকে শান্ত এক নদীর মায়াবী গতি। ফরাসিরা বিশ্বাস করে আকস্মিক আঘাতে প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করায়, আর স্প্যানিশরা ভালোবাসে পাসের জালে বুনে প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে। দুই ভিন্ন মেরুর এই দ্বৈরথ আজ ফুটবলপ্রেমীদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ইতিহাসের এক সোনালী হাতছানি এখন ফরাসিদের হাতের মুঠোয়। আট আসরের মধ্যে এটি তাদের পঞ্চমবারের মতো শেষ চারে পা রাখা। আজ জয় পেলেই জার্মানি ও ব্রাজিলের পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার গৌরব অর্জন করবে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। ফরাসিদের মূল শক্তি তাদের আক্রমণভাগের গতি ও তীক্ষ্ণতা।
ফরাসি শিবিরের প্রধান গোলমেশিন কিলিয়ান এমবাপ্পে; আজ টেক্সাসের মাঠে গতিঝড় তুলতে প্রস্তুত এই ফরোয়ার্ড।। ছবি: সংগৃহীত
কিলিয়ান এমবাপ্পে এই নীল ঝড়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর দৌড় যেন মেঘ চিরে নেমে আসা এক ঝলক বজ্রপাত, যা ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে পেছনে ফেলে যায়। টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৮টি গোল করে তিনি প্রতিপক্ষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। সাথে উসমান দেম্বেলের ৫ গোল এবং অলিসে-বারকোলাদের উপস্থিতি ফরাসিদের একেকটি বিধ্বংসী অস্ত্রে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে, স্পেনের ফুটবল এক শান্ত নদীর মতো, যা দেখতে ভীষণ শান্ত ও সুন্দর হলেও অলক্ষ্যেই সবকিছুকে নিজের অতলে তলিয়ে নেয়। লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই দলটির মাঝমাঠে রদ্রি ও পেদ্রিদের পায়ে বল এমন মসৃণতায় ঘোরে, মনে হয় যেন সময়ও থমকে দাঁড়িয়েছে। তাদের নিখুঁত পাসিংয়ের চক্র ভেদ করে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করা যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই প্রায় অসম্ভব।

স্প্যানিশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ ও মাঝমাঠের জাদুকর লামিনে ইয়ামাল; ফরাসি রক্ষণ ভাঙার প্রধান চাবিকাঠি তাঁর পায়েই।। ছবি: সংগৃহীত
আর এই নান্দনিক স্প্যানিশ স্রোতের মোহনায় দাঁড়িয়ে আছেন লামিনে ইয়ামাল। সদ্য ১৯ বছরে পা রাখা এই তরুণের পায়ে বয়সের কোনো ছাপ নেই; আছে বুকভরা সাহস। ইউরো কিংবা নেশনস লিগে ফ্রান্সকে হারানোর সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ইয়ামাল সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমাদের কোনো ভয় নেই।’ এই ভয়হীন তারুণ্যই আজ স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।

তবে আজকের রূপান্তরিত ফ্রান্স যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ধারালো ও গভীর। ফরাসি বস দিদিয়ের দেশমের সামনে আজ মারিও জাগালো কিংবা ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের মতো কিংবদন্তিদের অমর কীর্তিকে স্পর্শ করার রাত। খেলোয়াড় ও কোচ মিলিয়ে তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের এই বিরল ইতিহাস গড়তে হলে দেশমের নীল সৈন্যদের আজ রুখে দিতে হবে স্পেনের অপরাজেয় মাঝমাঠ।

ডালাসের এই সবুজ মঞ্চে শেষ বাঁশি বাজার পর একদল যখন ইতিহাসের নতুন পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম লেখাবে, অন্যদলকে তখন ড্রেসিংরুমের নিস্তব্ধ অন্ধকারে স্বপ্নভঙ্গের অশ্রু মুছতে হবে। ফুটবল আজ কার পক্ষ নেবে—নীল বারুদের নাকি লাল নদীর? উত্তরটা তোলা রইল মাঠের ৯০ মিনিটের রোমাঞ্চের কাছে।