মার্কিন হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার দাবি

ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥ প্রণালী হরমুজে ইরানের বন্দর ও দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার জবাবে বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।

বুধবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর, কুয়েতের আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে প্রণালী হরমুজ সংলগ্ন কয়েকটি রাডার ও বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনায় হামলা চালায়। ওয়াশিংটনের দাবি, একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা চালানো হয়েছে।

আইআরজিসি দাবি করেছে, জর্ডানের আজরাক ঘাঁটিতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং বাহরাইন ও কুয়েতে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

হামলার পর বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজানো হয়। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুভাবাপন্ন আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলায় সক্রিয় ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এ পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক উত্তেজনার একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সিরিক শহরের একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে দুটি পানির ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে।

একই সঙ্গে বাহিনীটি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ‘চূড়ান্ত ও কঠোর’ প্রতিক্রিয়া জানাতে তাদের বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে তার পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনকেই বহন করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র আজরাক অঞ্চলের দিকে আসার সময় প্রতিহত ও ভূপাতিত করা হয়েছে। এতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন স্থানে পড়লেও কোনো হতাহত বা উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।

হামলার পর বাহরাইন ও কুয়েতে বিমান হামলার সতর্কসংকেত (সাইরেন) বেজে ওঠে। কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা ‘বৈরী আকাশীয় লক্ষ্যবস্তু’ প্রতিহত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Quincy Institute for Responsible Statecraft-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রিটা পার্সি বলেন, ওয়াশিংটনের হামলার দ্রুত জবাব দিয়ে তেহরান নতুন ধরনের একটি সামরিক নীতির ইঙ্গিত দিয়েছে।

তার ভাষায়, “ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হামলার জবাব দ্রুত, কঠোর এবং আনুপাতিকভাবে দিতে হবে। অন্যথায় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় দায়মুক্তির সঙ্গে ইরানে হামলা চালাতে পারবে।”

তিনি আরও বলেন, ইরান স্পষ্ট করে দিতে চায় যে হামলার আকার বা পরিধি যাই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো আক্রমণের জবাব দেওয়া হবে।

তবে একই সঙ্গে ত্রিতা পারসি সতর্ক করে বলেন, “প্রতিবার এমন ঘটনা ঘটার পর উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর সক্ষমতা ও পারস্পরিক আস্থা আরও কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় সংঘাতে মঙ্গলবার আবারও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযান জোরদার হওয়ায় শান্তি আলোচনার অগ্রগতিও জটিল হয়ে পড়েছে।

তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মোহাম্মদ ভাল জানান, সর্বশেষ হামলার পরও কোনো পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে চায় বলে মনে হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই সর্বশেষ পাল্টা হামলা মেনে নিয়ে অভিযান বন্ধ করবে, নাকি নতুন করে হামলা চালাবে—তা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হবে।”

তবে তার মতে, উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরতে আগ্রহী। যদিও ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের প্রতি আস্থাহীনতার কথা প্রকাশ্যে বলে আসছে।