মনিরামপুরে দুই ইউপি চেয়ারম্যানের গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ১৩, আটক ৬

0

স্টাফ রিপোর্টার, মনিরামপুর (যশোর) ॥ যশোর মনিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বর্তমান ও সাবেক দুই ইউপি চেয়ারম্যানের বিরোধ আবারও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রাতভর মুজগন্নি গ্রামে দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনসহ ১৩ জন আহত হন। ভাঙচুর করা হয় ফকির রাস্তা মোড়ে আওয়ামীলীগের কার্যালয়সহ সেখানে থাকা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর বাঁধানো ছবি। প্রতিবাদে বর্তমান চেয়ারম্যান গ্রুপের কর্মী-সমর্থকরা। যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়ক প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী অবরোধ করে রাখা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। সংঘর্ষের ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক চেয়ারম্যান একে অপরকে দোষারোপ করেছেন। রাতভর পুলিশি অভিযানে সাবেক চেয়ারম্যান গ্রুপের ৬ নেতাকর্মী আটক হয়েছে। এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করায় মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, গতবছরের ২৮ নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে শ্যামকুড় ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি ও আলমগীর হোসেনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নৌকার প্রার্থী হন আলমগীর হোসেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি। ফলে দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এলাকায় দেখা দেয় ধারাবাহিক সংঘর্ষ। এক পর্যায়ে মাঠে টিকতে না পেরে আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুজ্জামান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে নৌকার প্রার্থী আলমগীর হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনের পর থেকে শ্যামকুড় ইউনিয়নে দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে আসছে। এরই অংশ হিসেবে সোমবার দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াসহ সংঘর্ষ হয়।
শ্যামকুড় ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি জানান, সোমবার দুপুরে বাঙালীপুর গ্রামে তার কর্মী হাবিবুর রহমানকে মারপিট করেন বর্তমান চেয়ারম্যানের চাচা আইয়ুব হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করলে সন্ধ্যার পর বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে মুজগুন্নি গ্রামের হায়দার আলীকে মারপিট করা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইকরামুল কবির জানান, সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন নেতাকর্মীদের নিয়ে মুজগুন্নি গ্রামের মোড়ে যান স্থানীয় কর্মীদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান ও তার বেশ কয়েকজন কর্মী-সমর্থক। এ সময় বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা নিয়ে দুই গ্রুপের কয়েক কর্মীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াসহ সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে আহত হন বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি শাহিনুর রহমান, অজিত ঘোষ, সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ছবুরোননেছা, মামুন হোসেনসহ ১২ জন। পরে ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন, অজিত ঘোষসহ আহত অন্যদেরকে উদ্ধারের পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনের বাম হাত ও পা ভেঙ্গে যাওয়ায় তাকে রাতেই যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাত নয়টার দিকে ফকির রাস্তা মোড়ে স্থানীয় আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে বর্তমান চেয়ারম্যানের কয়েকজন কর্মীকে মারপিট করা হয়। ভাঙচুর করা হয় দলীয় কার্যালয় ছাড়াও বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর বাঁধানো ছবি।
এদিকে হামলার প্রতিবাদে আলমগীর হোসেনের কর্মী-সমর্থকরা রাত নয়টার দিকে সুন্দলপুর বাজারে প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এক পর্যায়ে পুলিশ গিয়ে রাত এগারোটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে পুলিশ বিভিন্ন এলাকা থেকে সাবেক চেয়ারম্যান গ্রুপের ৬ নেতাকর্মীকে আটক করে। এরা হলো-জামলা গ্রামের হোসাইন আহম্মদ, শ্যামকুড় গ্রামের ফজলুর রহমান, মুজগুন্নি গ্রামের বাবুল হোসেন, রায়হান হোসেন, রেজাউল করিম ও হাফিজুর রহমান।
অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান চেয়ারম্যানের কর্মী-সমর্থকরা হামলার জের হিসেবে মঙ্গলবার সকালের দিকে মুজগন্নি গ্রামে সাবেক চেয়ারম্যানের কর্মী আবদুর রহিমের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে। পরে তাকে উদ্ধারের পর কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, গত ইউপি নির্বাচনের পর থেকে বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন ও তার সন্ত্রাসীরা এলাকায় তার কর্মী-সমর্থকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানোসহ মারপিট করছে। এছাড়াও অনেক নেতাকর্মীর দোকানপাট, ঘর, জমি দখল করা হচ্ছে।
তবে, এ অভিযোগ অস্বীকার করে বর্তমান চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর থেকে সাবেক চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান ও তার লোকজন পরিকল্পিতভাবে তার কর্মী-সমর্থকদের ওপর একের পর এক হামলা চালিয়ে এলাকায় সন্ত্রাসের রাম রাজত্ব কায়েম করে চলেছে।
মনিরামপুর থানা পুলিশের ওসি নূর-ই-আলম সিদ্দীকি জানান, সংঘর্ষের ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা করা হয়েছে।