মনিরামপুরে আমন সংগ্রহে চাষিদের তালিকায় ভুয়া নামের ছড়াছড়ি

0

স্টাফ রিপোর্টার, মনিরামপুর (যশোর) ॥ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নের সরনপুর গ্রামের মৃত আবদুস সাত্তারের স্ত্রী জাহানারা বেগমের বয়স ৭৮ বছর। মাঠে তার কোন ফসলি জমি নেই। নেই কোন কৃষি কার্ডও। তিনি আমন ধানের চাষও করেননি। অথচ আমন সংগ্রহের তালিকায় নাম রয়েছে তার। সরকারি খাদ্যগুদামে ন্যায্যমূল্যে বিক্রির জন্য তার নামে বরাদ্দ করা হয়েছে এক মেট্রিক টন ধান। অথচ তিনি জানেন না এই খবর। একই গ্রামের ভ্যানচালক শাহাজানের স্ত্রী আছিয়া বেগমের কোন জমি না থাকলেও তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এক মে.টন ধান। তিনিও জানেন না এ সম্পর্কে। শুধু আছিয়া বেগম ও জাহানারা বেগম নন, এভাবে আমন সংগ্রহের তালিকায় রয়েছে জলকর রোহিতা গ্রামের তরিকুল ইসলাম, সাধন বিশ্বাষ, মামুদকাটি গ্রামের আলমগীর হোসেন, আমিনুলাহ, কদমবাড়িয়া গ্রামের রফিক গাজী, গাংড়ার হুমায়ুন কবিরসহ অসংখ্য ভুয়া নামের ছড়াছড়ি। লটারির মাধ্যমে ধান ক্রয় তালিকার দুই হাজার ১৫০ জনের মধ্যে এমন অসংখ্য নামই রয়েছে, যাদের কোন কৃষি কার্ড নেই এবং তারা আমন চাষও করেননি। বিভিন্ন কৃষকের সাথে আলাপ করে ভুয়া তালিকার এসব চিত্র ফুটে উঠেছে। তালিকায় এমন ভুয়া নাম দেখে ুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ভুক্তভোগী কৃষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসী। অথচ উপজেলা কৃষি অফিসার হীরক কুমার সরকারের দাবি, কৃষি কার্ডধারী আমন চাষিদেরই তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত অফিসার মনিরুজ্জামান মুন্না জানান, মনিরামপুরে এবার আমন ধান সংগ্রহের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৩১ মে.টন। কৃষি অফিসের প্রস্তুতকৃত ৪৫ হাজার চাষির মধ্যে লটারির মাধ্যমে চুড়ান্ত করা হয়েছে ২ হাজার ১৫০ জনকে। ১ হাজার ৪০ টাকা মণ দরে প্রতি চাষির কাছ থেকে এক থেকে দেড় মে.টন ধান সংগ্রহের শুরু করার তারিখ ছিল গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে। কিন্তু মনিরামপুরে ক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয় ১২ ডিসেম্বর। নিয়ম রয়েছে কার্ডধারী যেসব চাষি চলতি মৌসুমে আমন চাষ করেছেন শুধুমাত্র সেসব চাষির নাম ক্রয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্তরা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে গোজামিল দিয়ে তড়িঘড়ি করে তালিকা প্রস্তুত করায় ভুয়া নামের ছড়াছড়ি হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত চাষিদের নাম বাদ পড়েছে।
সরেজমিন জানা যায়, মনিরামপুর উপজেলার রোহিতা ইউনিয়নে আমন চাষির তালিকার ৬১ ক্রমিকে নাম রয়েছে সরনপুর গ্রামের ভ্যানচালক শাহাজানের স্ত্রী আছিয়া বেগমের। তার নামে বরাদ্দ হয়েছে এক মে.টন ধান। কিন্তু আছিয়া বেগম জানান, তার নামে বরাদ্দের খবর তিনি জানে না। এছাড়াও তিনি আমন চাষ করেননি। তালিকার ১৩৮ নম্বর ক্রমিকে নাম রয়েছে প্রতিবেশী মৃত আবদুস সাত্তারের স্ত্রী জাহানারা বেগমের। তার নামেও বরাদ্দ করা হয়েছে এক মে.টন ধান। এ খবর শোনামাত্রই তিনি চমকে ওঠেন। তিনি জানান, মাঠে কোন জমি নেই, ধান বিক্রির তালিকায় তার নাম এলো কীভাবে? জলকর রোহিতা গ্রামের সাধন বিশ্বাসের নাম রয়েছে তালিকার ১২৩ ক্রমিকে। আর প্রতিবেশী তরিকুল ইসলামের নাম রয়েছে ১৬২ নম্বর ক্রমিকে। এর মধ্যে সাধন বিশ্বাস বর্তমানে পরিবার-পরিজন নিয়ে পার্শ্ববর্তী কেশবপুর উপজেলায় বসবাস করেন। তরিকুল ইসলাম রিকসা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এরা কেউ আমন চাষ করেননি। লটারির মাধ্যমে ধান ক্রয় তালিকার ২ হাজার ১৫০ জনের তালিকায় আলমগীর হোসেন, আমিনুলাহ, রফিক গাজী, হুমায়ুন কবির, আবুল বাশার, আবদুল হামিদসহ অসংখ্য ভুয়া নামের ছড়াছড়ি রয়েছে। আর এসব ভুয়া নাম দেখে প্রকৃত আমন চাষি, জনপ্রতিনিধিসহ এলাকাবাসী হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আপে করে মাহমুদকাটি গ্রামের আমন চাষি নুর আলম জানান, তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। অথচ ধান সংগহের তালিকায় তার নাম নেই। অপর চাষি নাজিম উদ্দিন জানান, তিনি সাত বিঘা জমিতে আমন চাষ করলেও তালিকায় তার নাম স্থান পায়নি। খেদাপাড়া ইউপি সদস্য তায়জুল ইসলাম মিলন জানান, তার ওয়ার্ডে কখন তালিকা হয়েছে সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। তালিকা প্রস্তুতকারীদের মধ্যে উপ-সহকারি কৃষি অফিসার বিলাল হোসেন ভুয়া নামের ব্যাপারে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত অফিসার মনিরুজ্জামান মুন্না জানান, বুধবার পর্যন্ত মাত্র ১২২ মে.টন আমন সংগ্রহ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার হীরক কুমার সরকার জানান, কৃষি কার্ড ও আমন চাষি বাদে কোন তালিকা করা হয়নি। আর যারা কৃষি কার্ড নেই বলছেন, তারা হয়তো কার্ড হারিয়ে ফেলেছেন। আমন ক্রয় কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহসান উলাহ শরিফী জানান, অভিযোগের বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।