বি এম আসাদ ॥ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনী (বিএলএফ)-এর বৃহত্তর যশোর জেলার অধিনায়ক, প্রবীণ রাজনীতিক ও কিংবদন্তি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি আর নেই। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টায় যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮০ বছর।
তিনি এক কন্যা, পুত্রবধূ, পুতনি ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার একমাত্র কন্যা ফারজানা আলী কানাডা থেকে দেশে ফিরে বাবার চিকিৎসা দেখভাল করছিলেন। এর আগে তার সহধর্মিণী ও একমাত্র ছেলে রাজেন আলী রাজু মারা যান।
কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্দুল গফফার জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি একিউট কিডনি সমস্যা, ব্রেন ক্ষয়সহ বার্ধক্যজনিত নানান জটিল রোগে ভুগছিলেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মুক্তিযোদ্ধা মহলসহ যশোরের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
চিকিৎসা ও শেষ দিনগুলো
গত ১২ মে শহরের রেলবাজারস্থ নিজ বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি করা হয়। দুইদিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সে সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সেখানে তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং সার্বিক খোঁজখবর রাখেন। প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের তদারকিতে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর গত ৭ জুন তাকে যশোর শহরের নিজ বাসায় আনা হয়। কিন্তু ৮ জুন (সোমবার) তিনি পুনরায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে আবারও যশোর জেনারেল হাসপাতালের সিসিইউতে নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় ৯ জুন রাতে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

নেতৃবৃন্দের শেষ শ্রদ্ধা
মৃত্যুর পর বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনির মরদেহ শহরের ষষ্ঠীতলা রেলবাজার সংলগ্ন নিজ বাসভবনে নেওয়া হলে তাকে এক নজর দেখতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করেন। খবর পেয়ে মরহুমের বাসায় যান এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দীর্ঘ সময় কাটান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম। এছাড়া মরহুমের বাসায় যান জেলা বিএনপির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাবেক পৌর মেয়র মারুফুল ইসলাম, জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা খাইরুল হোসেন, জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান মুকুল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ও ভোরের সাথী যশোরের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, যশোর ইনস্টিটিউটের কোষাধ্যক্ষ শাহজাহান আলী খোকন, জেলা জাসদের সহ-সভাপতি আহসান উল্লাহ ময়না, যশোর সাহিত্য পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ শাহীন ইকবাল, সামাজিক ব্যক্তিত্ব রোকন বেপারী, যশোর কলেজের সরকারি অধ্যাপক মো. মুক্তার আলী ও আজহার আলী স্বপনসহ প্রতিবেশীরা।
গার্ড অব অনার ও জানাজা
বাদ আসর যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে জেলা প্রশাসনের পক্ষে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও যশোর পৌরসভার প্রশাসক মো. রফিকুল হাসানের নেতৃত্বে মরহুমকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এরপর বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মরদেহে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় শরিক হন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. রফিকুল হাসান, সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হুসাইন, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান অ্যাডভোকেট রবিউল আলম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার এ এইচ এম মুযহারুল ইসলাম মন্টু, বর্তমান সদস্য সচিব আব্দুল মালেক, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম উদ-দৌলা, প্রেস ক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, যশোর ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক এ জেড এম সালেক (আবু সালেহ স্বপন), নাট্যকলা সম্পাদক আলমগীর হোসেন বাবু, জেলা সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি হারুন অর রশিদ, জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক আনিছুর রহমান মুকুল, অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু, শাহজাহান আলী খোকন, আইইবি’র কবির হোসেন, সিপিবি নেতা অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন, বাসদ নেতা হাসিনুর রহমান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ নেতা তসলিম উর রহমান, জেলা যুবদল নেতা কবির হোসেন বাবু, জিল্লুর রহমান মানিক, জেলা জাসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কায়েস, শরীফ আহমেদ বাপ্পি, মোস্তাফিজুর রহমান বাবর, আবুল বাসার মুকুল, আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যক্ষ হারুন অর রশিদ, সাইফুল ইসলাম তুহিন, জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের (জেইউজে) সভাপতি সাজেদ রহমান, সাবেক সভাপতি সাজ্জাদ গনি খান রিমন, বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ যশোরের সদস্য সচিব আনোয়ারুল করীম সোহেল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু, উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব, বিবর্তন যশোরের সভাপতি নওরোজ আলম খান চপল, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন অমিত এবং জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির অনুপ কুমার পিন্টু ও কর্নেল জামিল স্মৃতি সংসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন দোদুলসহ সর্বস্তরের মুসল্লি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ
জানাজার আগে জেলা প্রশাসন ছাড়াও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ, যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ, যশোর ইনস্টিটিউট পরিচালনা পরিষদ, ইনস্টিটিউট নাট্যকলা সংসদ, উদীচী যশোর, চাঁদের হাট যশোর, কিংশুক, তীর্যক, স্পন্দন, পুনশ্চ, জেলা পূজা উদযাপন পর্ষদ ও বাঘারপাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। জানাজা শেষে মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার কাজীপুরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে মরহুমের ছেলের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। আগামী রোববার বাদ আসর মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক
মহান মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তি ১৯৪৭ সালের ১৭ জানুয়ারি যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কাজীপুর বলাডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রয়াত রফিউদ্দিন এবং মা প্রয়াত মনোয়ারা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। শিক্ষাজীবনে তিনি যশোর মুসলিম একাডেমী থেকে এসএসসি, যশোর মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজ থেকে এইচএসসি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
আলী হোসেন মনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি পূর্ব বাংলা ইস্ট পাকিস্তান ছাত্রলীগের বৃহত্তর যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক (তৎকালীন সভাপতি একরামুল কবির) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফল শাখার সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ (নিউক্লিয়াস)-এর অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ব্যাচে ভারতের দেরাদুনে যুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর মুজিব বাহিনীর প্রধান হিসেবে বৃহত্তর যশোরে নেতৃত্ব দিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন কোনো বেসামরিক প্রশাসন কার্যকর ছিল না, তখন তিনি যশোর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালে রাজনৈতিক দল জাসদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং দীর্ঘদিন জেলা জাসদের সভাপতি ও পরবর্তীতে জাসদ একাংশের (ইনু) জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে বিভক্ত জাসদ ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। জেলা আওয়ামী লীগের কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও প্রতিটি নির্বাচনে দলটির পক্ষে সক্রিয় প্রচারণায় অংশ নিতেন।
আগামী ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি এই মহান বীরের ৮০তম জন্মবার্ষিকী ব্যাপক আয়োজনে উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ, যশোর’। কিন্তু সেই উদযাপনের আগেই থেমে গেল এক প্রদীপ্ত সংগ্রামী জীবন।





