বিশ্বকাপে ফুটবলারদের প্রবেশের সময় প্রটোকল দেন বাংলাদেশের তৌহিদুল

0
'আশা করি একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে'; কোয়ার্টার ফাইনাল শেষে নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের কথা জানালেন তৌহিদুল।। ছবি: সংগৃহীত

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে ফিফার সেরিমনিস টিমের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের তরুণ তৌহিদুল ইসলাম। প্রতিটি ম্যাচ শুরুর আগে খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশের প্রটোকল পালন, অংশগ্রহণকারী দেশের অফিশিয়াল পতাকা বহন এবং উদ্বোধনী আয়োজনের নানা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি।

রাজশাহীতে জন্ম নেওয়া তৌহিদুল ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে যান। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল; পরিবারের সঙ্গে বিশ্বকাপ দেখা এবং আর্জেন্টিনার সমর্থন করার স্মৃতি বহন করেন তিনি। এর পাশাপাশি স্কুলজীবনে স্কাউটিং এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট, রোটারি ও লায়ন্স ক্লাবের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত থেকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশে থাকাকালীন ফিফার ওয়েবসাইটে নিউজলেটারের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন তৌহিদুল। ২০২৫ সালে বিশ্বকাপের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি পেয়ে আবেদন করেন এবং কয়েক মাস পর লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত ট্রায়আউটে অংশ নেওয়ার ডাক পান। সেখানে শত শত প্রার্থীর মধ্যে দলগত কাজ, যোগাযোগদক্ষতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়া শেষে মে মাসে তিনি ফিফার সেরিমনিস টিমের জন্য নির্বাচিত হন।

কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে কানাডা দলের সঙ্গে পতাকা বহন করেন তৌহিদুল ইসলাম।। ছবি: সংগৃহীত

প্রশিক্ষণ পর্ব শেষে সেরিমনিস টিমের মধ্য থেকে ১০ সদস্যের একটি ‘ফ্ল্যাগ প্রটোকল টিম’ গঠন করা হয়, যেখানে জায়গা পান তৌহিদুলও। এই দলের সদস্য হিসেবে কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচে কানাডা দলের অফিশিয়াল পতাকা বহনের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

লস অ্যাঞ্জেলেস ভেন্যুতে বিশ্বকাপের মোট আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচের দিন খেলা শুরুর প্রায় পাঁচ ঘণ্টা আগে থেকেই কাজ শুরু হয় সেরিমনিস টিমের সদস্যদের। চেক-ইন প্রক্রিয়া শেষে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পর মাঠে হয় পূর্ণাঙ্গ রিহার্সাল, যেখানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন থেকে শুরু করে পতাকা বহন ও মাঠে প্রবেশের প্রতিটি ধাপের মহড়া দেওয়া হয়। এই মহড়ায় খেলোয়াড়দের পরিবর্তে অংশ নেয় স্থানীয় ফুটবল একাডেমির শিশুরা।

ম্যাচ শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টা আগে দলটি টানেলে অবস্থান নেয়, যেখানে নিরাপত্তাজনিত কারণে মুঠোফোন জমা রাখতে হয়। এই সময়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাছ থেকে দেখা ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ হয় তৌহিদুলের। তিনি জানান, এই দায়িত্ব পালনের সময় বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু এবং স্পেনের লামিন ইয়ামালসহ একাধিক আন্তর্জাতিক তারকা ফুটবলারের সঙ্গে করমর্দনের সুযোগ হয়েছে তাঁর। এ ছাড়া ভিভিআইপি এলাকার পাশ দিয়ে দায়িত্ব পালনের সময় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং সাবেক ইংলিশ ফুটবলার ডেভিড বেকহামকেও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানান তিনি। নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে সে সময় ছবি তোলা সম্ভব না হলেও এসব মুহূর্ত স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।

দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন দেশের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। সহকর্মীদের কাছে বাংলাদেশের ফুটবল-উন্মাদনা এবং বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশজুড়ে সাজসজ্জার গল্প তুলে ধরেছেন তিনি, যা শুনে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন এবং কেউ কেউ বাংলাদেশ ভ্রমণের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন বলে জানান তৌহিদুল।

গত ১০ জুলাই স্পেন ও বেলজিয়ামের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর দায়িত্ব পালন শেষ হয়েছে। সামনে স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য একটি সমাপনী অনুষ্ঠান রয়েছে। তবে তৌহিদুলের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে—বাংলাদেশ একদিন ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলবে এবং সেই দিন লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রি-ম্যাচ সেরিমনিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়াই হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।