বাঘারপাড়ায় মানবপাচার মামলায় আসামি কাইয়ুম ঢাকায় গ্রেফতার

0
ছবি: সংগৃহীত।

বাঘারপাড়া (যশোর) সংবাদদাতা ॥ বাঘারপাড়ায় মানবপাচার মামলায় মো. কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উপজেলার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামের যুবক সোহেল রানা জুয়েলকে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল দালালচক্র।

উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামের জুয়েলের স্ত্রী মুক্তা বেগমের মামলায় ঢাকার কেরানীগঞ্জের মুসলিমনগর এলাকা থেকে র‌্যাবের সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক।

২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি বাঘারপাড়া উপজেলার ঘোপ দুর্গাপুর গ্রামের যুবক সোহেল রানা জুয়েলকে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলে ১২ লাখ টাকা নিয়ে প্রথমে দুবাই, সেখান থেকে কাজাখস্তানে নিয়ে নির্যাতন করে আসামিরা। অবশেষে নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে কোনোমতে জীবন নিয়ে দেশে ফিরে আসেন সোহেল।

এ ঘটনায় জুয়েলের স্ত্রী মুক্তা বেগম চলতি বছরের ৬ এপ্রিল বাঘারপাড়া থানায় কাইয়ুম ও তার স্ত্রী নূরজাহানসহ অজ্ঞাতদের নামে মামলা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান বলেন, মানব পাচার মামলার অপর আসামি নূরজাহান দেশের বাইরে রয়েছেন। দেশে ফিরলে তাকে গ্রেফতার করা হবে।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সোহেল রানা জুয়েলকে প্রতি মাসে এক হাজার ডলার বেতনে অস্ট্রেলিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলেছিল দালালচক্র। থাকা-খাওয়া সব মালিকের, প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা ডিউটি, এমন সব প্রলোভন দেখিয়ে ১২ লাখ টাকা নিয়ে প্রথমে দুবাই, সেখান থেকে কাজাখস্তানে নিয়ে তার ওপর চালানো হয় নির্যাতন।

অবশেষে নিঃস্ব হয়ে পালিয়ে কোনোমতে জীবন নিয়ে দেশে ফিরেছেন সোহেল। দালাল নূরজাহান ঢাকার কেরানীগঞ্জের মুসলিমনগর এলাকার মো. কাইয়ুমের স্ত্রী। ভুক্তভোগী জুয়েল জানান, অস্ট্রেলিয়ায় ভালো কাজ দেওয়ার কথা বলে দালাল তার সঙ্গে ১৬ লাখ টাকার চুক্তি করে। প্রথমে ১২ লাখ টাকা দিতে হবে, দেশটিতে যাওয়ার পর বাকি ৪ লাখ। কিন্তু ১২ লাখ টাকা দিলেও তাকে অস্ট্রেলিয়া পাঠায়নি দালাল নূরজাহান ও তার স্বামীসহ চক্রের সদস্যরা।

২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি সোহেলকে পাঠানো হয় কাজাখস্তানে। সেখান থেকে কোনোরকমে পালিয়ে প্রথমে জীবন বাঁচান। দালালরা তাকে সেখানে আটকে রেখে মুক্তিপণ হিসাবে ৩০ লাখ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেয়।

জুয়েল আরও জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি মালয়েশিয়া যান এবং সেখানে একটি হোটেলে শেফের কাজ করতেন। পরে সেই চাকরি ছেড়ে আরও দুটো প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। সেখানে পরিচয় হয় দালাল নূরজাহানের সঙ্গে। তিনি (জুয়েল) ইউরোপে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দেশে ফিরে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে নূরজাহানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চুক্তি ফাইনাল হয়। ৬-৮ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা দেয় দালাল। জুয়েল বলেন, চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়া হলেও নূরজাহান তাকে ঘুরাতে থাকেন।

অবশেষে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি বিজনেস ভিসায় এয়ার এরাবিয়ার একটি ফ্লাইটে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই। সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় কাজাখস্তানে। দেশটির হোটেলে থাকাকালেই শুরু হয় নির্যাতন। ওই হোটেলে আরও দুই বাংলাদেশির সঙ্গে জুয়েলের পরিচয় হয়। তিনজনের কাছ থেকেই পাসপোর্ট কেড়ে নেয় নূরজাহানের প্রতিনিধি। এরপর ২৪ জানুয়ারি একটি প্রাইভেটকারে তাদের তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হয় হোটেল থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দূরে শিমক্যাট নামে একটি ফাঁকা ফ্যাক্টরির মতো একটি জায়গায়। দালালের প্রতিনিধি জানায়, এখান থেকে বের হতে হলে তাকে ৩০ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে প্রাণে মেরে ফেলা হবে।

এরপর ২৮ তারিখ রাতে তারা তিনজন (নোয়াখালীর মিজান ও নারায়ণগঞ্জের হালিম) শলাপরামর্শ করেন ফ্যাক্টরি থেকে পালাবেন। হালিম রাজি হননি। পরে মিজানকে সঙ্গে নিয়ে সোহেল সেখান থেকে পালান। এ অবস্থায় ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনের নম্বরে তারা খুদে বার্তা পাঠিয়ে বিপদের কথা জানান।

পরে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন আইনজীবী সব শুনে জুয়েলকে দেশে পাঠাতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। সোহেলের স্ত্রী ধার করে টাকা পাঠালে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে জুয়েল ২০ এপ্রিল দেশে ফিরতে সক্ষম হন।