ফকিরহাটে কয়েক কোটি টাকার সরকারি মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামার নানা সমস্যায় জর্জিত

0
ছবি: সংগৃহীত।

আবুল আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট)॥ ফকিরহাটে সরকারি মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি নানা সমস্যায় জর্জিত। এখানে রয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের উন্নত জাতের মহিষ। অথচ এসব মূল্যবান প্রাণীর নিরাপত্তায় রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। প্রায় ৪ কিলোমিটার সীমানা প্রাচীরের একাংশের নিচে বড় বড় ফাঁক।

ফলে ফাঁক গলে সহজেই মহিষ বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও আবার সীমানা প্রাচীরই নেই; কোনোমতে বাঁশের বেড়া দিয়ে সীমানা ঘেরা হয়েছে। পুরোনো দেয়ালের অনেক অংশ ও আশ-পাশের জমি ও মাটি হয়ে নিচু হয়ে গেছে। এ সুযোগে স্থানীয় লোকজন খামারে ঢুকে মহিষের জন্য চাষ করা উন্নত জাতের পুষ্টি সমৃদ্ধ ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ফকিরহাটের পিলজঙ্গা এলাকায় প্রায় ৯৫ একর জমির ওপর খামারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। উন্নত জাতের মহিষের প্রজনন, জাত উন্নয়ন এবং দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়ানোই এর প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমানে খামারে প্রায় ২৯০টি মহিষ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি ভারতীয় মুররাহ জাতের।

এছাড়া ইতালিয়ান মেডিটেরেনিয়ান, জাফরাবাদী ও লিরিরাবি জাতের মহিষ রয়েছে। সর্বশেষ ভারত থেকে উন্নত জাতের ১২০টি মুররাহ মহিষ প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে আমদানি করা হয়েছিল।

খামারটি পরিচালনার জন্য অনুমোদিত রাজস্ব খাতে ৫২টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন মাত্র ১০ জন। সম্প্রতি ২২ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে গেছে।
খামারের প্রায় ৪ কিলোমিটার সীমানার মধ্যে প্রায় দুই কিলোমিটার দেয়াল কয়েক বছর আগে নির্মাণ করা হয়।

কিন্তু ওই দেয়ালের নিচের অংশে বিভিন্ন স্থানে বড় ফাঁকা রয়েছে। এতে মহিষ বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কোথাও আবার দেয়ালই নেই। সেখানে কোনোমতে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। অপর প্রায় দুই কিলোমিটার পুরোনো সীমানাপ্রাচীরের উচ্চতা ছিল প্রায় পাঁচ ফুট। আশপাশের জমি ও মাটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় দেয়ালটি এখন আরও নিচু হয়ে গেছে।

খামার সংশ্লিষ্টরা জানান, দিনের পাশাপাশি রাতেও স্থানীয় কিছু মানুষ দেয়াল টপকে খামারে প্রবেশ করে। তারা উন্নত জাতের মহিষের জন্য সংরক্ষিত খাদ্যঘাস কেটে নিয়ে যায়। খামারে পাংচং, রেড পাংচং ও নেপিয়ারজাতীয় উন্নত ঘাস উৎপাদন করা হয়। দুর্বল সীমানাপ্রাচীরের কারণে এসব সম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া মানুষের প্রবেশে মহিষ, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় ২৯০টি মহিষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে সংকট। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গোবর ও মূত্র জমা হয়। গোবর-মূত্র মিশ্রিত পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। এতে খামারের বিভিন্ন স্থানে কাদাযুক্ত ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা গেলে এসব বর্জ্য কৃষিজমিতে ব্যবহার করে জৈব উপাদান হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

মহিষের স্বাস্থ্য ও প্রজনন ব্যবস্থাপনাতেও আধুনিক সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, প্রজনন ব্যবস্থাপনা ও জাত উন্নয়নের জন্য আধুনিক গবেষণা ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি প্রয়োজন হলেও খামারে পূর্ণাঙ্গ এ ধরনের সুবিধা নেই। স্থায়ী পশু চিকিৎসকও নেই। ফলে অসুস্থ মহিষের চিকিৎসায় বাইরে থেকে চিকিৎসক আনার ওপর নির্ভর করতে হয়।

মহিষের স্বাভাবিক শারীরিক পরিচর্যার জন্যও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গরমের সময় শরীর ঠান্ডা রাখা ও গোসলের জন্য খামারে পাকা পুকুরের ব্যবস্থা নেই। উন্নত জাতের মূল্যবান মহিষের স্বাস্থ্য ও উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে এ ধরনের সুবিধা প্রয়োজন বলে জানান ফকিরহাট উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মো. হাসান আলী।

খামারে এসব অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে পর্যাপ্ত উন্নয়ন বরাদ্দ না থাকায় সীমানাপ্রাচীর সংস্কার, নিচু জমি উঁচু করা, ড্রেনেজ ও পাকা পুকুরসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা যাচ্ছে না।

খামারের পাশের এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, সুবিশাল এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দেশের একমাত্র সরকারি মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেনো দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।

খামারের সিনিয়র সহকারী পরিচালক শেখ আল মামুন বলেন, ‘সীমিত জনবল ও নানা সংকটে খামারটি জর্জরিত। তারপরও দেশের মাংস ও দুধ উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করছি। বর্তমানে খামারের সীমানা প্রাচীরসহ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।’