নিজেদের করা আইনেই ফেঁসে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ, অপরাধ প্রমাণ হলে হতে পারে দল নিষিদ্ধ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত

0
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু; দোষী সাব্যস্ত হলে দল নিষিদ্ধের সুযোগ ।। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিল এবং দলীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি সুযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, এই শাস্তির বিধানটি স্বয়ং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই আইনে যুক্ত হয়েছিল। ফলে নিজেদের প্রণীত ও সংশোধিত আইনের আওতায়ই এখন দলটির বিচার ও সম্ভাব্য নিষিদ্ধ হওয়ার আইনি সমীকরণ সামনে এসেছে।

ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই প্রণয়ন করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে এই আইনের ২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ‘অরগানাইজেশন’ বা ‘সংগঠন’ শব্দটি যুক্ত করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারই। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১০ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করে নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যার মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল, অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে শাস্তি দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধের বিধান রেখে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক (কো-অর্ডিনেটর) আনসার উদ্দিন খান পাঠান জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছিল জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। আবেদনটি তদন্ত সংস্থায় আসার পর একটি বিশেষ টিম স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত সব অপরাধের তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময়ের ঘটনা হওয়ায় প্রতিবেদন দাখিলে কিছুটা সময় লাগতে পারে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এবং সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, ট্রাইব্যুনালের বিদ্যমান ও সংশোধিত আইনেই আওয়ামী লীগের বিচার করা সম্ভব। তদন্ত সংস্থা যদি দলটির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অপরাধের প্রমাণ পেয়ে প্রসিকিউশনে প্রতিবেদন দাখিল করে, তবে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে ট্রাইব্যুনাল দলটির লাইসেন্স বা নিবন্ধন স্থগিত/বাতিল, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং সম্পত্তি জব্দের নির্দেশনা ইস্যু করতে পারবেন।

এদিকে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আদালতের রায় না আসা পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।

তবে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭৪ থেকে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত অপরাধের বিচার করা হলেও আওয়ামী লীগের কমিটিগুলো এসব অপরাধ রেজুলেশন বা দলীয় সিদ্ধান্তে করেছে কি না, তা প্রমাণ করা জটিল হবে। এই বিচারের পেছনে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা বা নির্বাচন থেকে দূরে রাখার ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন, দল হিসেবে নিষিদ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ অন্য কোনো নামে রাজনীতিতে ফিরে আসতে আইনি বাধা থাকবে না।

উল্লেখ্য, বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব মতে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে অন্তত ১ হাজার ৯২৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এছাড়া জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন, যার নির্দেশদাতা হিসেবে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিমধ্যেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।