নারী ও শিশু নির্যাতনে ফাঁসির ২৭৩ আসামি কনডেমড সেলে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতা

0
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যার দায়ে ফাঁসির ২৭৩ আসামি কনডেমড সেলে থাকলেও ডেথ রেফারেন্স জটে বছরের পর বছর রায় কার্যকর হচ্ছে না। দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত ২৮ হাজার বন্দী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।। ছবি: সংগৃহীত

নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারের কনডেমড সেলে রয়েছেন ২৭৩ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাত্র ২৬ জনের। বাকিরা রায় পাওয়ার পরেও বছরের পর বছর কারাগারে অপেক্ষা করছেন ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, সব মামলা মিলিয়ে দেশের ৭৪টি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা ২ হাজার ৭০৭ জন। মোট বন্দী ৭৪ হাজার, যদিও ধারণক্ষমতা ৪৬ হাজার।

রায়ের ৮ বছর পরেও ফাঁসি হয়নি

২০০৫ সালে যৌতুকের কারণে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় কিশোরী সামিনাকে (১৬)। মামলার রায় আসতে লাগে ১৩ বছর। ২০১৮ সালে স্বামী জাফরসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। রায়ের আট বছর পরেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। সামিনার মা নাজমা বেগম (৬০) ফুটপাতে চুড়ি বিক্রি করে জীবন চালান। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “এত দিনেও ফাঁসি হইল না।” তিনি আরও জানান, মাস দুয়েক আগে আসামিদের স্বজনরা এসে তাঁকে মারধর করে গেছেন।

মামলাটি পরিচালনা করা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড বিভাগের পরিচালক দীপ্তি সিকদার বলেন, বিচারিক এই দীর্ঘসূত্রতা সমাজকে ন্যায়বিচার দ্রুত নিশ্চিতের বার্তা দেয় না। অনেক সময় ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবার আসামিপক্ষের হুমকির মুখে দিন কাটান।

পল্লবীর রায়ের পর আলোচনা সামনে

গত ১৯ মে পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ১৯ দিনের মাথায় ৭ জুন রায় দেন আদালত। দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে ডেথ রেফারেন্সের জন্য।

এই প্রেক্ষাপটে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আপিল শুনানিতে বিলম্বের বিষয়টি তিনি উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে এনেছেন। প্রধান বিচারপতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনতে সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠনের কথা বলেছেন।

মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায়ও একই পরিস্থিতি। গত বছর রায়ে আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও মামলাটি এখনো ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায়।

জামিনে পালানোর নজিরও আছে

২০১২ সালে হাতিরপুলে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার পর আসামি সাইদুজ্জামান বাচ্চুকে হাতেনাতে ধরা হয়। ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় আসে। কিন্তু রায়ের মাস ছয়েক আগেই জামিন পেয়ে পলাতক হয়ে যান তিনি। কিশোরীটির মা ২০২৩ সালে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “গরিব বিচার পায় না।”

কারা কর্তৃপক্ষের কথা

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মানতে চান না, বেপরোয়া আচরণ করেন। তিনি বলেন, বিচারাধীন মামলা দ্রুত শেষ হলে বন্দীর সংখ্যা কমে আসবে।

আইনের পরিবর্তন

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে প্রথম বিশেষ আইন হয় ১৯৮৩ সালে। বর্তমান আইনটি ২০০০ সালের, যা সর্বশেষ ২০২৫ সালে সংশোধিত হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০২৬ নামে পরিচিত। ধর্ষণের মামলায় তদন্তের সময় ১৫ দিন ও বিচারের সময় ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিচারক প্রয়োজন মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন।