জমে উঠেছে ঐতিহ্যের বলুহ মেলা, দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়

0

মুকুরুল ইসলাম মিন্টু, চৌগাছা (যশোর) ॥ চৌগাছার ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ মেলা গত মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে, চলবে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তাই দিন যত যাচ্ছে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ততই বাড়ছে। মেলার সার্বিক নিরাপত্তায় মেলা কমিটি রয়েছেন যথেষ্ট সজাগ।
উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের হাজরাখানা গ্রামে প্রতি বাংলা সনের ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় বলুহ মেলা। প্রায় সাড়ে ৩শ বছর ধরে গ্রামটির মাঝ বরাবর প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের পাশ দিয়ে বসে মেলা। প্রশাসন ১০ দিনের অনুমতি দিলেও তা অঘোষিত ভাবে মাসব্যাপী চলবে বলে জানান স্থানীয়রা।
অন্যান্য বছরগুলোর মতো এ বছরও মেলার প্রথম ও প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে কাঠের তৈরি হরেক রকমের বাহারি সব আসবাবপত্র। প্রচার আছে বলুহ মেলার আসবাবপত্রের দাম তুলনামুলক কম, তাই দূর-দূরান্ত হতে সবাই চলে আসেন এই মেলায়। এ ছাড়া বলুহ মেলার আর একটি অন্যতম দিক হচ্ছে শিশু খেলনা ও বাহারি রং আর স্বাদের মিঠাই। মেলায় আগতরা এ সব মিষ্টির স্বাদ নিতে কোনভাবেই ভুল করেন না।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন মেলা চত্বরে দেখা যায়, সব বয়সের মানুষের সরব উপস্থিতি। মা তার শিশুকে নিয়ে ছুটে যাচ্ছে নাগরদোলা, নৌকা বাইচসহ বিভিন্ন খেলনায় উঠাতে। পিতা সন্তানকে কাঁধে নিয়ে কিনছেন শিশুর পছন্দের খেলনা।
এ সময় কথা হয় মেলায় আগত মহেশপুর উপজেলার যাদবপুর গ্রামের রুবেল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই মেলাতে আসি এ বছর ভিড় অনেক বেশি। বারবাজারের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বলুহ মেলা প্রাণের মেলা তাই মেলা শুরু হলে এখানে আসতে ভুল করি না। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মহিবুল ইসলাম বলেন, মেলায় ঘুরতে খুব ভালো লাগে। অস্থায়ী হোটেলে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছি, বেশ মজা। মেলার সার্বিক পরিস্থিতি দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন জীবননগরের নয়ন হোসেন। স্কুল শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুন (৬) বলে, বাবার সাথে মেলায় এসেছি অনেক খেলনা কিনেছি, কালও আসবো।
অস্থায়ী দোকান দিয়ে বসা দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা এবারের মেলায় দর্শনার্থীর উপস্থিতি ও বেচাকেনা ভালো হওয়ায় বেজায় খুশি। ফার্নিচার ব্যবসায়ী চুয়াডাঙ্গার আশরাফুল, কুষ্টিয়ার সজিব হোসেন বলেন, লাখ লাখ টাকার ফার্নিচার এনেছি এখনও সে ভাবে বেচাকেনা শুরু হয়নি, তবে শেষমেষ বিক্রি ভালো হবে বলে আশা করছি। শিশু খেলনা ব্যবসায়ী যশোরের বিল্লাল হোসেন বলেন প্রথম দিন হতেই বিক্রি ভালো হচ্ছে এবার দর্শকের উপস্থিতি বেশি, মিষ্টি ব্যবসায়ী নড়াইলের খোকন কু-ু বলেন, প্রতিবারই মেলাতে আসি এবার মেলায় বেচাকেনা ভালো হওয়ায় খুশি লাগছে। ঢাকা থেকে নাগরদোলা নিয়ে এসেছেন মো. মামুন। প্রতিদিনই আশানুরুপ কাস্টমার পেয়ে তিনি বেজায় খুশি।
হাজরাখানা গ্রামের বাসিন্দা বিএম বাবুল আক্তার, সুশান্ত, শুকুমার পাল, মিঠু বলেন, বলুহ মেলা শুধু হাজরাখানা গ্রামবাসীর জন্য নয় এ অঞ্চলের গৌরব আর অহংকার। মেলাটি মানুষের হৃদয়ে এমন ভাবে স্থান করে নিয়েছে যে, প্রশাসনের অনুমতির না হওয়ার খবরে অনেকে কাঁদেন আর অনুমতির খবরে বয়ে যায় ঈদের আনন্দ। কোন প্রচার প্রচারনা, কিংবা মাইকিং কিছুই লাগে না অথচ ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার এলেই পীর বলুহ’র রওজাকে ঘিরে মেলায় মানুষের ঢল নামে।
মেলা পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নারায়ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান শাহিন ও ক্যাশিয়ার ইউপি সদস্য মনিরুজ্জামান মিলন বলেন, মেলা শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাপ্ত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।
নির্বাহী কর্মকর্তা ইরুফা সুলতানা বলেন, গ্রামীণ এই মেলা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। মেলা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ ড. এম মোস্তানিছুর রহমান বলেন, করোনার কারনে মেলা দু বছর বন্ধ ছিল, আবার অত্যন্ত জাকজমকভাবে শুরু হয়েছে। মেলায় আগতদের সার্বিক নিরাপত্তায় প্রশাসনসহ মেলা কমিটি সর্বদা সজাগ রয়েছেন। শান্তিপূর্ণ ভাবেই মেলা শেষ হবে বলে তিনি আশা করেন।