‘চোখের সামনেই সহকর্মীদের লাশ ভেসে যেতে দেখেছি’ ৩ দিন উত্তাল সাগরে ভেসে থাকা আল আমিনের লোমহর্ষক গল্প

0
তিন দিন বঙ্গোপসাগরে ভেসে থাকার পর উদ্ধার হওয়া জেলে আল আমিন হাওলাদার গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।। ছবি: সংগৃহীত
টানা তিন দিন উত্তাল বঙ্গোপসাগরে অনাহারে ভেসে থাকার পর অলৌকিকভাবে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরেছেন পটুয়াখালীর গলাচিপার জেলে আল আমিন হাওলাদার (৪২)। সাগরের বুকে একটি ছোট ফিশিং বয়া আঁকড়ে ধরে প্রবল ঢেউয়ের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে চোখের সামনে সহকর্মীদের মরদেহ সাগরে ভেসে যেতে দেখলেও কেবল বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছায় লড়াই চালিয়ে গেছেন।

গত রোববার রাত ১০টার দিকে আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকার পূর্ব-দক্ষিণে গভীর বঙ্গোপসাগরে ১১ জন মাঝিমাল্লাসহ একটি মাছ ধরার ট্রলার উল্টে ডুবে যায়। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক অবস্থায় সবাই নিখোঁজ হন। এর মধ্যে গত সোমবার ট্রলারমালিক এমাদুল সিকদারসহ ৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও বাকি ৬ জন নিখোঁজ থেকে যান।

নিখোঁজদের একজন আল আমিন ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত ভোলার ঢালচর নদ এলাকায় পৌঁছালে গত বুধবার সন্ধ্যায় স্থানীয় জেলেরা তাঁকে উদ্ধার করেন। এরপর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাঁকে পটুয়াখালীতে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে প্রচুর লবণাক্ত পানি পেটে ঢুকে আল আমিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বর্তমানে তাঁকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন আল আমিন তাঁর জীবনযুদ্ধের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে জানান, ট্রলারটি ডুবে যাওয়ার পর প্রথম দুই দিন তিনি সহকর্মী হারুন ও আকাশের সঙ্গে ডুবে যাওয়া ট্রলারের অংশ ধরে ভেসে ছিলেন। ওই সময় উল্টে থাকা ট্রলারের কেবিন থেকে তাঁর আত্মীয় ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ বের হয়ে সাগরে ভেসে যেতে দেখেন। তিনি এই দৃশ্য দেখে কাঁদতে থাকেন, একপর্যায়ে কান্না চেপে রেখে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে থাকেন।

তিনি বলেন, রোববার রাত ১০টার দিকে তিনি ও অন্য মাঝিমাল্লারা গভীর বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলেছিলেন। এ সময় হঠাৎ তীব্র বেগে বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়।

এ সময় ট্রলারের মালিক এমাদুল সিকদার, হারুন মিয়া, আকাশ, রাকিব, শাকিল, নাজমুল, বায়জীদ ও তিনি (আল আমিন) ট্রলারের বাইরে থাকায় সহজে বের হতে পারেন। কিন্তু তাঁর আত্মীয় ফোরকান হাওলাদার, ফোরকানের ছেলে সায়েম ও পানপট্টি এলাকার এবাদুল ট্রলারের কেবিনে থাকায় বের হওয়ার সুযোগ পাননি।রোববার রাত ১০টার দিকে তিনি ও অন্য মাঝিমাল্লারা গভীর বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলেছিলেন। এ সময় হঠাৎ তীব্র বেগে বাতাস শুরু হলে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়।

এ সময় ট্রলারের মালিক এমাদুল সিকদার, হারুন মিয়া, আকাশ, রাকিব, শাকিল, নাজমুল, বায়জীদ ও তিনি (আল আমিন) ট্রলারের বাইরে থাকায় সহজে বের হতে পারেন। কিন্তু তাঁর আত্মীয় ফোরকান হাওলাদার, ফোরকানের ছেলে সায়েম ও পানপট্টি এলাকার এবাদুল ট্রলারের কেবিনে থাকায় বের হওয়ার সুযোগ পাননি।

একপর্যায়ে উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে হারুন ও আকাশের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আল আমিন। এরপর কেবল একটি ছোট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে একা ভেসে থাকেন তিনি। ক্ষুধা ও পিপাসায় জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে ভোলার ঢালচরের জেলেরা তাঁকে উদ্ধার করে।

গলাচিপা জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, ১১ জেলের মধ্যে এ পর্যন্ত আল আমিনসহ ৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন হারুন, আকাশ, ফোরকান, সায়েম ও এবাদুল। নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসামগ্রী প্রদান করা হয়েছে।