গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত মান রক্ষায় শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি

এমআরডিআই’র খুলনা বিভাগীয় মতবিনিময় সভা

0
ছবি: সংগৃহীত।

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) আয়োজনে রোববার খুলনা বিভাগীয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার পেশাগত ও নৈতিক মানোন্নয়নের পথ নিয়ে আলোচনা এবং সংবাদমাধ্যমে স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করার সম্ভাব্য কাঠামো মূল্যায়নের অংশ হিসেবে রোববার এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভ এর আওতায় ধারাবাহিক সংলাপ কার্যক্রমের প্রথম এ সংলাপটি আয়োজন করে এমআরডিআই।

সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও মালিকপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার মাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রতি পাঠক-দর্শকের আস্থা জোরদারে শক্তিশালী স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।

সম্পাদকীয় নীতিমালার কার্যকর চর্চা, পরিচালন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, এবং পাঠক-দর্শকের জন্য উপযোগী অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি বাস্তব ও কার্যকর পথ হতে পারে বলেও তারা একমত পোষণ করেন। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নৈতিক মান বজায় রেখে, স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার মধ্য দিয়ে দর্শক-শ্রোতার আস্থা ফিরিয়ে আনতে এটি সহায়তা করবে বলেও তারা মত দেন।

সংবাদমাধ্যমের মালিক ও প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদ সিদ্ধান্তগ্রহীতা, সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

এমআরডিআই-এর পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংবাদমাধ্যমের সংস্কারে স্ব-নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। সভার শুরুতে একটি উপস্থাপনায় তিনি বলেন, সেলফ-রেগুলেশন যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ তত কমবে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা তার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। যতক্ষণ পর্যন্ত পাঠক, শ্রোতা, দর্শকের গণমাধ্যমের ওপর আস্থা থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে। এই আস্থার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে, তিনি বলেন। সংবাদকর্মীদের পাশাপাশি সম্পাদক এবং মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের ওপর জোরারোপ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান এবং দ্য ডেইলি স্টার এর কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, সরকারের কাছে দাবি জানাই খুব দ্রুত পরিকল্পনা প্রকাশ করুন আপনারা কেমন গণমাধ্যম কমিশন চান। আমরা বলতে চাই, আমরা এমন একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন চাই যেখানে আমরা আমাদের ভুল নিজেরাই সংশোধন করব।

সাইবার সুরক্ষা আইনে কথিত অপরাধগুলোর যথাযথ সংজ্ঞায়ন ছাড়াই সাজা বাড়ানোর উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের সামগ্রিক সংস্কার নিয়ে কাজ করতে হবে। সামগ্রিক সংস্কার না হলে বর্তমানের এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে। শুধু শাস্তি বাড়িয়ে বা আইন কঠোর করে কখনো কোনো জায়গার পরিস্থিতির উন্নতি করা যায়নি।

একইসঙ্গে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সেলফ সেন্সরশিপের দিকে চলে না যাই।

সভায় আলোচকরা একমত হন যে টেকসই স্ব-নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা প্রয়োজন, যারা সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চাপ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশের বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা জানান যে নৈতিক সাংবাদিকতা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তারা গণমাধ্যম মালিকদের সময়মতো বেতন প্রদান, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

আলোচনায় আরও অংশ নেন, দৈনিক লোকসমাজ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আনোয়ারুল কবির নান্টু, দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক একরাম-উদ-দ্দৌলা, দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন, দৈনিক মাথাভাঙ্গা সম্পাদক ও প্রকাশক সরদার আল আমিন, দৈনিক সময়ের খবর সম্পাদক ও প্রকাশক মো. তরিকুল ইসলাম,দৈনিক প্রবাহ সহকারী সম্পাদক খালিদ হোসেন, সাংবাদিক গৌরাঙ্গ নন্দী, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন সহকারী মহাসচিব এহতেশামুল হক শাওন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন যুগ্ম মহাসচিব হেদায়েত হোসেন মোল্লা, রূপান্তর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম খোকন, রাইটস যশোর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন, মানব সেবা ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শামীমা সুলতানা শীলু, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান সারা মনামী হোসেন, অগ্রগতি সংস্থা নির্বাহী পরিচালক আবদুস সবুর বিশ্বাস, এবং লিডার্স সাতক্ষীরা প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর শারমিন আরা লিনা।