কালীগঞ্জে স্কুলে ঢুকে শিক্ষককে মারধর: পুকুর লিজের বিরোধে যৌন নিপীড়নের সাজানো নাটকের অভিযোগ

0
মারধরে গুরুতর অসুস্থ সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে উদ্ধার করে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করার পর পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ॥ ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে স্কুল শিক্ষকের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। হামলার স্বীকার শিক্ষকের পরিবারের অভিযোগ, স্কুলের পুকুর লিজের টাকা স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক ইউপি সদস্যকে না দেওয়ার কারনে ওই শিক্ষকের সঙ্গে মতবিরোধ চলছিল। এর জেরে গত দুই সপ্তাহ যাবত শিক্ষককে নানা ভাবে হেনস্থার হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও শিক্ষক শাহ আলমের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন।

এ দিকে শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ছাত্রীর হাতে লেখা দাবিকৃত ‘স্বাক্ষরবিহীন’ চিঠি ও অভিযোগপত্র দায়ের প্রসঙ্গে বাদীপক্ষের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে এই লেখাটি ছাত্রীর নয় বলেও জানায় তার চাচা সৌরভ সরকার। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় এরই মধ্যে জেলা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শুরু হয়েছে সমালোচনা।

এদিকে শিক্ষক শাহ আলমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ প্রহরায় সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে বলেও নিশ্চিত করে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়শা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহ আলম কে স্কুলের অফিস কক্ষে ঢুকে বেধড়ক মারধর করে স্থানীয় ১০/১২ জন। স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ওই শিক্ষকের ওপর হামলা করা হয়। হামলায় স্থানীয় সৌরভ সরকার, বাবু, হাশিদুল সহ বেশ কয়েকজন নেতৃত্ব দেয় বলে স্থানীয় সূত্রে ও ভিডিও চিত্র পর্যবেক্ষণে এবং শিক্ষকের স্বজনদের মাধ্যমে তথ্য পাওয়া গেছে।

শিক্ষককে মারধরের পরে তাকে অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষককে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ শিক্ষককে থানা হেফাজতে নেয়। সন্ধ্যার দিকে ওই শিক্ষক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে ওই ঘটনায় শিক্ষকের ওপর হামলা ও মারধরের নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বড় বায়শা স্কুলের ঘটনা হলেও স্কুলের আশেপাশের কেউ এ ঘটনা জানতো না। পাশ্ববর্তী রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়া মোল্লা গতকাল মঙ্গলবার স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ কে ডেকে সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি অবহিত করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই স্কুলের অফিসে স্থানীয় লোকজন মব সৃষ্টি করে সহকারী শিক্ষকের ওপর হামলা চালায়। হামলার পরে শিক্ষকের শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে স্থানীয় লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে স্কুলের ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলে। পরে তারা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে শিক্ষার্থীর হাতে লেখা একটি অভিযোগপত্র তুলে দেয়। তবে ঘটনাস্থলে কথিত ভিকটিম শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না বলে জানা গেছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, উত্তেজিত স্থানীয় লোকজন শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ওই সময় স্থানীয়রা শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেন। সেসময় আমি ওই ছাত্রীর চাচা সহ উপস্থিত অন্যান্যদের কাছে লিখিত অভিযোগপত্র চাই। পরে তারা ঘটনাস্থল থেকে একটু দুরে গিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সাদা কাগজে হাতে লেখা অভিযোগপত্র দেয়। যেখানে ওই ছাত্রীর স্বাক্ষর বা তার পক্ষ্যে কারো স্বাক্ষর ছিল না।

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া ছাত্রীর হাতে লেখা দাবিকৃত সেই স্বাক্ষরবিহীন অভিযোগপত্র।

শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ওই চিঠিটি শিক্ষার্থীর নিজ হাতে লেখা কিনা সেটা আমি নিশ্চিত নই। ওই ছাত্রীও আমার সামনে এসে অভিযোগ করেনি বা নিজ হাতে অভিযোগপত্র দেয়নি। ছাত্রীর চাচা আমার কাছে অভিযোগপত্র দেন।

এদিকে হামলার শিকার শিক্ষকের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, স্কুলের পুকুরের লিজের টাকা চেয়েছিল রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক মেম্বার ইলিয়াস। আমার স্বামী স্কুলের টাকা অন্য কাউকে না দেয়ার পরামর্শ দেয়ায় তার সঙ্গে দুই সপ্তাহ ধরে ঝামেলা চলছিল। আমরা জানতে পেরেছি, স্থানীয় সৌরভ সরকার সাবেক মেম্বার ইলিয়াস মিলে একটি চক্র আছে প্রভাবশালী। তারা মিলে স্কুলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেও আমার স্বামীর জন্য পারছিল না। যে কারণে সৌরভের নেতৃত্বে ও ইলিয়াস মোল্লার ইন্ধনে মব করে স্থানীয় সমাজপতিরা আমার স্বামীর ওপর হামলা চালায়। হামলার এক পর্যায়ে আমার স্বামী শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা দ্রুত ঘটনাটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বলে চালিয়ে দেয়।

এদিকে এসব বিষয়ে জানতে ভিকটিম শিশুর মায়ের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়, তবে তিনি মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি। বাড়িতে গেলেও তিনি গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি তার দেবর সৌরভ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন।

এ বিষয়ে সৌরভ সরকার বলেন, আমার ভাতিজির সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। স্থানীয়রা ওই শিক্ষককে মারধর করেছে।

কালীগঞ্জে শিক্ষক শাহ আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া ছাত্রীর কাকার সেই লিখিত অভিযোগপত্র।

হাতে লেখা চিঠি কে লিখেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার ভাতিজির কথা হয়তো অন্য কেউ লিখে দিয়েছে। তবে কে লিখেছে আমি জানিনা। এ বিষয়ে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের খায়রুল ইসলাম নিরবের সঙ্গে কথা বলেন। একথা বলে তিনি ফোনকল রেখে দেন।

শিক্ষকের সঙ্গে পূর্ববিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে কোলা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বলেন, আমি শিক্ষক শাহ আলমকে চিনিই না। তার সঙ্গে আমার কখনো কথাও হয়নি। আর স্কুলের পুশকোনি (পুকুর) লিজের টাকা আমি কেন নিতে চাইবো? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

শিক্ষকের ওপর হামলার আগে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কি কথা হয়েছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে ইলিয়াস মোল্লা বলেন, আমি প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছিলাম যে, এলাকার লোকজন ঝামেলা করতে পারে। এর বেশি কিছু আমি জানি না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ বিষয়ে সবকিছু বলতে পারবেন। তাকে ফোন করেন।

এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ইলিয়াস মেম্বার আমার চাচা শ্বশুর। তবে স্কুলের পুকুর লিজের টাকা নিয়ে আমি দায়িত্ব নেয়ার আগে কারো সঙ্গে কিছু হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমি যখন এই স্কুলে ছিলাম না, তখন সহকারী শিক্ষক শাহ আলম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। সেই সময় পুকুর লিজের টাকা নিয়ে কি হয়েছে তা আমি জানি না।

শিক্ষা কর্মকর্তাকে দেয়া ছাত্রীর লেখা বলে দাবিকৃত অভিযোগপত্র প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই চিঠি কে লিখেছে তা আমি জানি না। তবে ছাত্রীর চাচা সৌরভ সরকার বাইরে থেকে এসে অভিযোগপত্র শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেয়।

ভিকটিম শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে কথা বলে স্কুলে প্রবেশের পরপরই সহকারী শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি অফিসে প্রবেশের পরপরই তারা হামলা করে। আমি জানি না কেন তারা এই হামলা চালিয়েছে।

শিক্ষকের ওপর কথিত অভিযোগ তুলে হামলার চাঞ্চল্যকর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী সহ সচেতন মহলের অনেকেই এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন।

ঝিনাইদহ সদরের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম লিকু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, বর্তমান সমাজব্যবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌছে গেছে যে, শিক্ষকরাই যেন এখন সমাজের বড় শত্রু! যে অবস্থা শুরু হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত মান সম্মান নিয়ে শিক্ষকতা করা যাবে কিনা নিশ্চিত নই। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও স্কুলের বিভিন্ন কাজে মাতবরি করতে না পারার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কারণে শিক্ষকদের আজ হয়রানি আজ মান সম্মান ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।

স্কুলে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলা ও মব সৃষ্টির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একজন শিক্ষকের ক্ষোভ ও বিচার দাবির বার্তা।

এদিকে শিক্ষকের ওপর হামলা ও শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জেলা পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, ছাত্রীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত করে এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া স্কুলের অফিসে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় যদি কেউ অভিযোগ দেয়, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষ্যে সে বিষয়েও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ, আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারও নেই।