এখনো নিস্তব্ধ শহীদ সাব্বিরের বাড়ি

0

স্টাফ রিপোর্টার, ঝিনাইদহ॥ নীরব -নিস্তব্ধ একটি বাড়ি। উঠোনে শুকানো হচ্ছে সোনালী ধান। ধান মেলে দিচ্ছেন যিনি, তার চোখে পানি। মুখে কাপড় চেপে ফিসফিস করে নিজের সঙ্গেই কি যেন বলছেন। অথচ কদিন আগেও এই বাড়িতে ছিল আনন্দ-উচ্ছলতা। এ বাড়ির কারো মুখে এখন আর হাসি নেই। বাড়ির বাসিন্দাদের চোখেমুখে কষ্টের ছাপ। এ চিত্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্র -জনতার আন্দোলনের বীর শহীদ সাব্বির আহমেদের বাড়ির। গত ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সাব্বির আহমেদ (২৩) ঢাকার উত্তরার আজমপুরে পানি ও শুকনো খাবার বিতরণ করছিলেন। ওই সময় পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন।
সাব্বির আহমেদ উত্তরার একটি কোম্পানিতে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। আমোদ আলী মন্ডল (৬০) ও রাশিদা খাতুন (৪৮) দম্পতির প্রথম সন্তান তিনি। সাব্বিরের পিতা কৃষিকাজ করেন। মা গৃহিনী। তিন ভাইবোনের মধ্যে সাব্বির সবার বড়। তার আরো এক ভাই ও এক বোন আছে। সাব্বিরের বোন সুমাইয়া (১৯) শেখপাড়া দুঃখী মাহমুদ ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। ছোট ভাই সাদিক আহমেদ (১৭) ঝিনাইদহ শহরের একটি মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে পড়াশুনা করে।
সরেজমিন শহীদ সাব্বিরের বাড়িতে গিয়ে চোখের পানি আটকে রাখা যায়নি। জীর্ণশীর্ণ আধাপাকা বাড়ি। বাড়িতে সবকিছুই কেমন এলোমেলো। যে উঠোনে সাব্বির শৈশব, কৈশোরে হাঁটতে শিখেছিল সেই উঠোন ভরা এখন হাহাকার। সাব্বির আহমেদের মা কান্না জড়ানো কন্ঠে বলেন,বাবাগো, কি আর বলব! ১৮ তারিখ দুপুর থেকেই আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন অস্থির লাগছিল। কোনো কারণ ছাড়াই ছটফট করে বেড়াচ্ছিলাম। সন্ধ্যায় খবর পেলাম, আমার বাজান (সাব্বির) আর নেই।
তিনি জানান, অভাব অনটনের কারণে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর সাব্বির আর পড়তে পারেননি। সাত মাস আগে (মার্চ মাসে) জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় চলে যান সাব্বির। উত্তরায় একটি টাইলস কোম্পানির অফিসে স্বল্প বেতনে চাকরি নেন।
চোখের পানি মুছতে মুছতে সাব্বিরের পিতা আমোদ আলী মন্ডল বলেন, ১৭ তারিখ আমাদের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় সাব্বিরের। সে ফোন করে আমাদের খোঁজখবর নেয়। আমার সঙ্গে কথা শেষ করে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে। আমরা তো বুঝতেই পারিনি ওটাই হবে সাব্বিরের শেষ কথা।
তিনি জানান, সাব্বির যে এলাকায় থাকত তার পাশেই তার মামাতো ভাই তরু (২২) থাকত। ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুরে ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। ওই সময় সাব্বিরের গলায় গুলি লাগে। একপাশ দিয়ে গুলি লেগে তা অন্যপাশ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। আন্দোলনের সময় সাব্বির ছাত্রদের মাঝে পানি ও শুকনো খাবার বিতরণ করছিল। নিখুঁত নিশানায় তাকে গুলি করে হত্যা করে হাসিনার পুলিশ। গত ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সাব্বিরের পিতা বলেন, প্রতিমাসে বাজান আমার হাতে ৫/৬ হাজার টাকা দিতো। তাই দিয়ে সংসার চালাতাম। সে অল্প বেতন পেতো। নিজের জন্যে সামান্য কিছু টাকা রেখে বাকি সব বাড়িতে পাঠিয়ে দিতো। আজ বাজান নেই। আমার সব শেষ। তিনি আরও বলেন, আমার টাকার দরকার নেই। আমার ছেলেটা যদি বেঁচে থাকত, আমার আর কিছুই লাগত না।
শহীদ সাব্বিরের মা রাশিদা খাতুন বলেন, তরু (সাব্বিরের মামাতো ভাই) প্রথম সাব্বিরের গুলি লাগার খবর দেয়। উত্তরার হাসপাতাল থেকে তরু আমার বাজানের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে। আমার ছোট ছেলে সাদিক (সাব্বিরের ছোট ভাই) আমার বাজানের জানাজা পড়িয়েছে।
সাব্বিরের মা আরও বলেন- ‘৫ আগস্ট পর্যন্ত থানা থেকে পুলিশ ফোন করে নানা বিষয় জানতে চাইতো। এখন আর পুলিশ খোঁজখবর করে না। আমরা ৫ আগস্ট পর্যন্ত ভয়ে ছিলাম। ছেলেকে ওরা হত্যা করেছে। আবার আমাদের ভয়ও দেখাতো।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা সাব্বিরের পরিবারকে একটি গরু কিনে দিয়েছে। এছাড়া জামায়াতে ইসলামী দুই লাখ টাকা ও বিএনপির পক্ষ থেকে ৬২ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে পরিবারটি। তবে এখন পর্যন্ত সাব্বিরের পরিবার সরকারি কোনো অনুদান পায়নি।
সাব্বিরের মা রাশিদা খাতুন বলেন, যারা আমার মতো হাজার হাজার মায়ের বুক খালি করেছে তাদের বিচার যেন সরকার করে। আর কোনোদিন যেন দেশের মানুষের বুকে পুলিশ বা অন্য কেউ গুলি চালাতে না পারে।