আফগানিস্তানের অর্থ ফেরত দেয়ার দাবি তালেবানের

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ বিদেশে থাকা আফগানিস্তানের অর্থ ফেরত দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে দাবি জানিয়েছে তালেবান সরকার। শুক্রবার ব্রিটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত আফগানিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আহমদ ওয়ালি হাকমালের এক সাক্ষাতকারে এই দাবি জানান তিনি। রয়টার্সকে আহমদ ওয়ালি হাকমাল বলেন, ‘এই অর্থ আফগান জনগণের। আমাদেরকে শুধু আমাদের অর্থই ফেরত দিন। এই অর্থ আটকে রাখা অনৈতিক এবং সকল আন্তর্জাতিক আইন ও মূল্যবোধের বিরোধী।’ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা আফগানিস্তানের অর্থ চলতি বছরের আগস্টে দেশটির প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ তালেবানের নেয়ার পর থেকেই আটকে দেয়া হয়েছে।
এদিকে আফগান সেন্ট্রাল ব্যাংকের এক বোর্ড সদস্য শাহ মেহরাবি রয়টার্সের কাছে সাক্ষাতকারে বলেন, আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক ধস এড়াতে ইউরোপীয় দেশ বিশেষ করে জার্মানিকে দেশটিতে থাকা আফগান অর্থ ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অবস্থা খুবই গুরুতর এবং অর্থের পরিমাণ কমে আসছে। এই বছরের শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানকে চালিয়ে নেয়া যাবে।’ যুক্তরাষ্ট্রে আফগানিস্তানের প্রায় নয় শ’ কোটি ডলারের তহবিল গচ্ছিত রয়েছে। অপরদিকে জার্মানির কমার্স ব্যাংকে ৪৩ কোটি ১০ ডলার ও সেন্ট্রাল ব্যাংকে নয় কোটি ৪০ লাখ ডলার সঞ্চিত রয়েছে। মেহরাবি বলেন, ‘যদি আফগানিস্তান তার অর্থ না পায়, ইউরোপ প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আপনি রুটি না পাওয়া ও তার জন্য সামর্থ্যবান না হওয়ার দ্বিমুখী বিপদে পড়ছেন। জনগণ বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তারা ইউরোপে যাবে।’ আফগানিস্তানে মানবিক দুর্যোগ প্রতিরোধে পশ্চিমা দেশগুলো সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানালেও তারা দেশটিতে তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি।
মেহরাবি জানান, প্রতিমাসে আফগানিস্তানে ‘সম্ভাব্য সংকট রোধে’ ১৫ কোটি ডলার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘যদি তহবিল আটকে থাকে, তবে আফগান আমদানিকারকরা তাদের বাণিজ্যের জন্য অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন না, ব্যাংক ধসে পড়বে, খাদ্য সংকট তৈরি হবে, মুদি দোকান খালি হয়ে পড়বে।’ ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাইন-ইলেভেনের সন্ত্রাসী হামলার জেরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ হামলার জন্য আফগানিস্তানে আশ্রয়ে থাকা আলকায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করেন। ওই সময় আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারের কাছে ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন প্রশাসনের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানান বুশ। তালেবান সরকার ওসামা বিন লাদেনকে তুলে দেয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে মার্কিনিদের কাছে প্রমাণ চায়। প্রমাণ ছাড়া তারা ওসামা বিন লাদেনকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বুশ প্রশাসন ও তালেবানের মধ্যে বিরোধের জেরে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তানে আগ্রাসন শুরু করে মার্কিন বাহিনী। অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রসজ্জ্বিত মার্কিন সৈন্যদের হামলায় তালেবান সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে একটানা দুই দশক যুদ্ধ চলতে থাকে দেশটিতে। এরইমধ্যে আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের সদস্য দেশগুলোও যুক্ত হয়। মার্কিনিদের সমর্থনে নতুন প্রশাসন ও সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠে দেশটিতে। ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন সৈন্যদের এক ঝটিকা অভিযানে নিহত হন ওসামা বিন লাদেন। ২০১৩ সালে অজ্ঞাতবাসে তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরেরও মৃত্যু হয়। তা স্বত্ত্বেও তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখে। দীর্ঘ দুই দশক আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বের বহুজাতিক বাহিনীর দখলের পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারের দোহায় এক দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর বিপরীতে আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অংশ নিতে তালেবান সম্মত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ঘোষণা অনুসারে ৩১ আগস্ট আফগানিস্তান থেকে বহুজাতিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ডেডলাইন থাকলেও ৩০ আগস্ট সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়। মার্কিনিদের সাথে চুক্তি অনুসারে ক্ষমতাসীন থাকা মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আফগান সরকারের সমঝোতার জন্য তালেবান চেষ্টা করলেও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। তালেবানের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মে মাসে বহুজাতিক বাহিনীর প্রত্যাহারের মধ্যেই পুরো দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে অভিযান চালানো শুরু করে তালেবান। ৬ আগস্ট প্রথম প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলীয় নিমরোজ প্রদেশের রাজধানী যারানজ দখল করে তারা। যারানজ নিয়ন্ত্রণে নেয়ার ১০ দিনের মাথায় কেন্দ্রীয় রাজধানী কাবুলে পৌঁছে যায় তালেবান যোদ্ধারা। তালেবান যোদ্ধারা অগ্রসর হতে থাকায় ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। গনির কাবুল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জেরে আফগান প্রশাসন ভেঙে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই দিনই কাবুলে প্রবেশ করে তালেবান যোদ্ধারা। তবে কাবুলের উত্তরের দুর্গম পাঞ্জশির প্রদেশ শুধু তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গিয়েছিলো। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধ যুদ্ধের কিংবদন্তি যোদ্ধা আহমদ শাহ মাসুদের ছেলে আহমদ মাসুদের নেতৃত্বে তালেবানবিরোধী বিদ্রোহী যোদ্ধারা এই উপত্যকায় অবস্থান নিয়েছিলো। ৬ সেপ্টেম্বর পাঞ্জশিরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মাধ্যমে পুরো আফগানিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তালেবান। এর পর ৭ সেপ্টেম্বর দলীয় প্রধান মোল্লা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদাকে রাষ্ট্রপ্রধান ও রাহবারি শুরার সদস্য মোল্লা হাসান আখুন্দকে প্রধানমন্ত্রী করে নতুন আফগান সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় দলটি।
সূত্র : রয়টার্স