‘আমিই বস’: জি–৭ সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ করে ট্রাম্পের মন্তব্য

0
জি–৭ শীর্ষ সম্মেলনের ওয়ার্কিং সেশনের বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁকে দেখা যাচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

শিল্পোন্নত দেশগুলোর শীর্ষ জোট জি–৭-এর বৈশ্বিক মঞ্চে আবারও নিজের চেনা মেজাজে ধরা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার ফ্রান্সে চলমান সম্মেলনের একপর্যায়ে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতিতে তিনি রসাত্মক ভঙ্গিতে মন্তব্য করেন, ‘আমিই বস’। ফ্রান্সের বিখ্যাত অবকাশযাপন কেন্দ্র এভিয়ঁ লে বেঁতে ১৫ থেকে ১৭ জুন অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ জোটের অন্য শীর্ষ নেতারা যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে যৌথভাবে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন জোগানোর বিষয়ে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সাথে নেতারা জানান, রাশিয়ার ওপর একের পর এক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে রণক্ষেত্রে ইউক্রেনের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশ মজুত ও সুবিধাজনক হয়েছে। মূলত এই জি-৭ নেতাদের সমন্বিত যৌথ ইশতেহারে যুদ্ধক্ষেত্রে কিয়েভের সাম্প্রতিক ও ক্রমবর্ধমান সাফল্যের বিষয়টিই জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে।

রাশিয়াকে ‘আক্রমণকারী’ পক্ষ বললেন ট্রাম্প

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোতিমির জেলেনস্কি ও তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা মূলত ট্রাম্পকে এটি বোঝানোর লক্ষ্য নিয়ে এই সম্মেলনে এসেছিলেন যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের পাল্টা প্রতিরোধ লড়াই সফলভাবে কাজ করছে। ক্রেমলিন এখন আর নিজের শর্তে কোনো শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার মতো অবস্থানে নেই। নেতাদের যৌথ বিবৃতি ও মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, দীর্ঘদিন যাবত সংশয় প্রকাশের পর অবশেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প জেলেনস্কির এই যুক্তির প্রতি সদয় হয়েছেন এবং তা গ্রহণ করেছেন। এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, চলমান সংঘাতের ফ্রন্টলাইনে ইউক্রেনের চেয়ে রুশ বাহিনীর সেনারাই বেশি মারা যাচ্ছে। এই পুরো সংকটের জন্য তিনি স্পষ্ট ভাষায় মস্কোকে ‘আক্রমণকারী’ পক্ষ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করান।

এর আগে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপ্রধান এমানুয়েল মাখোঁ মন্তব্য করেছিলেন, ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিন্তাভাবনা ও মানসিকতায় এখন একটি বাস্তবমুখী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের শীর্ষ নেতারাও মাখোঁর এই সুরেই সুর মিলিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত বছর কানাডায় অনুষ্ঠিত জি–৭ সম্মেলনটি ইউক্রেন ইস্যুতে কোনো যৌথ সিদ্ধান্ত বা ঐক্যমত্য ছাড়াই শেষ হয়েছিল। তবে এবার ভার্সাই প্রাসাদের জমকালো রাজকীয় নৈশভোজের আগে মাখোঁ ও ট্রাম্প উভয়েই এই সম্মেলনকে দারুণ সফল হিসেবে আখ্যা দেন। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ক্রেমলিনকে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য করার পুরো বিষয়টি এখনো ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপরই দুলছে, যা কিছুটা অনিশ্চয়তা জাগায়।

ইরানের চুক্তির বিষয়ে কূটনীতিকদের সতর্ক থাকার আহ্বান

ইউক্রেন ইস্যুর পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার প্রাথমিক শান্তিচুক্তিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জি–৭ নেতারা। তারা এই চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস দিলেও এতে নিজেদের ভূমিকা কেমন হবে, সে ব্যাপারে ট্রাম্পের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পাননি। ফলে ইউরোপীয় মিত্রদের মনে এক ধরণের উদ্বেগ কাজ করছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি অনভিজ্ঞ মার্কিন আলোচনাকারী দল হয়তো পরমাণু চুক্তির পরবর্তী কঠিন ধাপগুলো নিশ্চিত করতে কিংবা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির স্থায়ী সমাধান বের করতে ব্যর্থ হতে পারে, যার ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘ সময়ের জন্য থমকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই উদ্বেগের মধ্যেই ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে, তেহরানের সাথে হওয়া বর্তমান সমঝোতা স্মারকটি কোনোভাবেই চূড়ান্ত কিছু নয় এবং এই চুক্তি অমান্য করা হলে ওয়াশিংটন আবারও সামরিক বোমাবর্ষণ শুরু করতে পারে। নিজের স্বভাবসুলভ কড়া ভাষায় ট্রাম্প বলেন, ‘যদি এটি আমার পছন্দ না হয়, যদি তারা ঠিকঠাক আচরণ না করে, তবে আমরা সরাসরি গিয়ে আবার তাদের মাথার ঠিক মাঝখানে বোমাবর্ষণ শুরু করব, ঠিক আছে?’ যদিও ইউরোপের অংশীদারেরা প্রকাশ্যে এই সমঝোতাকে সমর্থন জোগাচ্ছেন, তবুও কূটনীতিকেরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের পরমাণু ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি (সহযোগী) বাহিনীকে দেওয়া সমর্থনের বিষয়ে একটি স্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ

আলাদাভাবে, জি–৭ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের জন্য চীনের ওপর তাঁদের দেশগুলোর নির্ভরতা কমাতে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে খনিজ মজুত রাখার পরিকল্পনাগুলো একসঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাকে (আইইএ) আরও বড় ভূমিকা দিয়ে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করা। মূলত প্রতিরক্ষা খাত, আধুনিক প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ধাতুর উৎস বহুমুখী করতে এবং এসব পণ্যে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পশ্চিমা শক্তিগুলো তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এ ছাড়া, শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্বনেতারা। এই বিশেষ সংলাপে ওপেনএআই (OpenAI)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রোপিক-এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) দারিও আমোদেইসহ সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ডিজিটাল বট ও এআই এজেন্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং এই আধুনিক প্রযুক্তি কীভাবে সত্য ও মিথ্যা তথ্যকে উপস্থাপন করছে, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সাথে গভীর ও বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।