সীমান্তে কাঁটাতার ইস্যুতে শুভেন্দুকে জবাব: বাংলাদেশ ভয় পায় না

0

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে দ্রুত পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। গতকাল সোমবার পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার রাজ্য সচিবালয় নবান্নে অনুষ্ঠিত নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনি জানান, আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফকে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই সীমান্ত নিরাপত্তাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, “রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গেছে, তাই সীমান্ত সুরক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন।”
নতুন সরকারের প্রথম বৈঠকে মোট ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে রয়েছে-
রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৩২১ জন বিজেপি কর্মীর পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ,
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তর,
কেন্দ্রীয় বিভিন্ন প্রকল্প যেমন ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ ও ‘বিশ্বকর্মা যোজনা’ বাস্তবায়ন,
আইএএস ও আইপিএস কর্মকর্তাদের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের অনুমতি,
ভারতীয় ন্যায় সংহিতা কার্যকর করা,
সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পাঁচ বছর বৃদ্ধি।
তবে সরকার পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও ‘স্বাস্থ্যসাথী’ বন্ধ হয়ে যেতে পারে- এমন শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “কোনো সরকারি প্রকল্প বন্ধ হবে না। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, মৃত ব্যক্তি বা “অভারতীয়” কেউ যেন সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা না পান, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মতো দেশকে এখন কাঁটাতার দিয়ে ভয় দেখানোর জায়গা নেই। বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারও কোনো ধরনের ভয়ভীতিতে বিশ্বাস করে না এবং প্রয়োজন হলে বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হবে।
হুমায়ুন কবির শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার সীমান্ত পরিস্থিতির সমালোচনা করে বলেন, অতীতে সীমান্তে গুলি করে হত্যা কিংবা কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে, যা আর কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। তার ভাষায়, “এই বাংলাদেশ আর গোলামীর বাংলাদেশ নয়। দেশের স্বার্থ রক্ষায় কী করতে হবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে।”
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সংলাপই সবচেয়ে কার্যকর পথ। তিনি জানান, ভারতের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেন ভারত থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারেন, সে বিষয়ে দিল্লি সতর্ক থাকবে।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট করেন তিনি। বলেন, “আমাদের সম্পর্ক মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে। আমরা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে চাই না।”
সম্প্রতি চীন সফর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হুমায়ুন কবির জানান, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমেই এগোতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর সীমান্তনীতি, অভিবাসন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য সামনে আসছে। এর প্রভাব বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও পড়তে পারে। বিশেষ করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও “অভারতীয়” প্রসঙ্গ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তবে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলই মনে করছে, উত্তেজনার বদলে সংলাপ ও পারস্পরিক সহযোগিতাই সীমান্ত স্থিতিশীলতার একমাত্র কার্যকর পথ।