দুই দিনে ৫ একর জমি উদ্ধার গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের, উচ্ছেদ ঘর-বাড়ি রাজনৈতিক কার্যালয়সহ শতাধিক স্থাপনা

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর শহরের উপশহর এলাকায় সরকারি জমি উদ্ধার করতে দুই দিনব্যাপী ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। অভিযানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তিনটি দলীয় কার্যালয়সহ চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় পাঁচ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।

রোববার সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান সোমবার (১১ মে) বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলে। উপশহরের গাবতলা মোড়, বি-ব্লক, সি-ব্লক, আমতলা বস্তি, হাইকোর্ট মোড়, ঢাকা রোড ও উপশহর ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ধাপে ধাপে এ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে যশোর হাউজিং এস্টেটের সরকারি জমি দখল করে অবৈধভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয় ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছিল। এসব অবৈধ দখলদারকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ শনিবার এলাকায় মাইকিং করে স্বেচ্ছায় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কেউ জমি ছাড়েনি।

এরপর রোববার সকালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অভিযান শুরু হয়। অভিযানে অংশ নেয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

প্রথম দিনে শহরের বাবলাতলা এলাকায় সরকারি খাস জমির ওপর নির্মিত একটি পাকা বাড়ি ভেঙে ফেলার মধ্য দিয়ে অভিযান শুরু হয়। পরে গাবতলা মোড়ে রাস্তার দুই পাশজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান, টিনশেড স্থাপনা ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করা হয়। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছিল। ফলে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যানজট ও জনদুর্ভোগ তৈরি হচ্ছিল।

পরে অভিযান চালানো হয় উপশহরের বি-ব্লক বাজার এলাকায়। সেখানে রাস্তার পাশে অবস্থিত আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সি-ব্লকে সরকারি জমিতে নির্মিত দুটি আবাসিক ভবন উচ্ছেদ করা হয়। একপর্যায়ে উপশহর পার্কসংলগ্ন এলাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের আরও একটি আঞ্চলিক কার্যালয় ও পাশের একটি মুদি দোকান ভেঙে ফেলা হয়। অভিযানের সময় সেখানে বিপুলসংখ্যক উৎসুক মানুষ ভিড় করেন।

প্রথম দিনের অভিযানের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল পার্কসংলগ্ন আমতলা বস্তি উচ্ছেদ। সেখানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, টিনশেড কক্ষ ও ঝুপড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বস্তির ভেতরে গড়ে ওঠা দুটি কারখানাও উচ্ছেদ করা হয়।

উচ্ছেদের সময় অনেক পরিবারকে মালামাল সরাতে হিমশিম খেতে দেখা যায়। নারী ও শিশুদের কান্নায় পুরো এলাকায় মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ মাথায় করে আসবাবপত্র সরিয়ে নিতে থাকেন।

সোমবার দ্বিতীয় দিনের অভিযানে উপশহর, হাইকোর্ট মোড়, ঢাকা রোডসহ বিভিন্ন ব্লকে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলা অভিযানে ছোট-বড় আরও প্রায় ২০০ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

এ সময় হাইকোর্ট মোড়ে অবস্থিত বিএনপির একটি কার্যালয়ও উচ্ছেদ করা হয়। এছাড়া রাস্তার পাশে নির্মিত অস্থায়ী দোকান, গ্যারেজ, গুদাম ও বসতঘর ভেঙে ফেলা হয়।

অভিযান চলাকালে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উচ্ছেদ ঠেকাতে কয়েকজন বাসিন্দা প্রতিবাদ জানান। তবে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকায় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে রেখে অভিযান পরিচালনা করেন। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেই বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা অপসারণ করা হয়।

উচ্ছেদকৃত অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ দাবি করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করলেও হঠাৎ উচ্ছেদ অভিযানে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন।
একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে তাদের সেখানে বসবাস ও ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এখন সেই দায় সাধারণ মানুষকে নিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

আমতলা বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, আমরা গরিব মানুষ। কোথায় যাব, কীভাবে থাকব কিছুই বুঝতে পারছি না। আগে যদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করত, তাহলে এত কষ্ট হতো না।

জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান বলেন, সরকারি জমি দখলমুক্ত করতে নিয়ম মেনেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বারবার নোটিশ ও মাইকিং করার পরও দখলদাররা সরে যাননি। নানা টালবাহানার কারণে শেষ পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দুই দিনব্যাপী অভিযানে প্রায় পাঁচ একর সরকারি খাস জমি উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া জমির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

অভিযানকালে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ যশোরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাদুল ইসলাম তুহিন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আশিক আহম্মেদ সাকিব, উপসহকারী প্রকৌশলী রাসেল মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।