এহসান-উদ-দৌলা মিথুন : কিছু মানুষের চলে যাওয়া কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, একটি সময়েরও বিদায়। কিছু মানুষের শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না, তাঁদের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না; বরং যত দিন যায়, ততই গভীর হয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। তরিকুল ইসলাম ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু যশোরের রাজনীতি, মানুষের ভালোবাসা, অসংখ্য নেতাকর্মীর স্মৃতি আর সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতায় তিনি আজও জীবন্ত। তাঁর কণ্ঠস্বর নেই, সেই স্নেহমাখা ডাক নেই, বিপদের দিনে সাহস জোগানো হাতটি নেই। অথচ স্মৃতির অলিগলিতে আজও যেন শুনতে পাই তাঁর সেই পরিচিত কণ্ঠ—‘ভয় করিস না বাবু…।’
তাঁকে আমি শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে দেখিনি। দেখেছি একজন অভিভাবক, একজন দূরদর্শী সংগঠক, একজন মানবিক মানুষ এবং সর্বোপরি একজন সাংবাদিকবান্ধব জননেতা হিসেবে। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার পেছনে রয়েছে পারিবারিক সম্পর্ক, শৈশবের স্মৃতি এবং পেশাগত জীবনের অসংখ্য অভিজ্ঞতা। সেই স্মৃতিগুলো আজও আমাকে আবেগাপ্লুত করে।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতির দরজা খুলে বসেছি। ফিরে দেখতে চাই সেই মানুষটিকে, যাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, যাঁর সান্নিধ্যে সমৃদ্ধ হয়েছি, যাঁর একটি বাক্য আজও আমার সাহসের উৎস। এই স্মৃতিচারণ কেবল একজন রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়; এটি আমার দেখা একজন মানুষ, একজন অভিভাবক এবং সাংবাদিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এক জননেতার প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
যে নেতা কর্মীর নাম জানতেন, মনের ভাষাও বুঝতেন

নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় ক্ষমতা কিংবা পদ-পদবিতে নয়; মানুষের হৃদয়ে কতটা জায়গা করে নেওয়া যায়, সেটিই একজন নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন। তরিকুল ইসলাম ছিলেন সেই বিরল গুণের অধিকারী। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন সাধারণ কর্মীর নাম মনে রাখা, কর্মীর বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানো, চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনের অবস্থা বুঝতে পারাএসব ছিল তাঁর নেতৃত্বের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
তিনি জানতেন, একটি রাজনৈতিক দল কেবল কয়েকজন শীর্ষ নেতার সমষ্টি নয়; এর প্রাণশক্তি তৃণমূলের কর্মীরা। তাই ক্ষমতায় থাকুন কিংবা ক্ষমতার বাইরে—দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের জায়গাটি ছিল প্রায় একই রকম। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার এই গুণই তাঁকে নেতা থেকে জননেতায় পরিণত করেছিল।
আজকের রাজনীতিতে যখন কর্মী ও নেতার দূরত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বের ধরন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়একজন নেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর কর্মীদের ভালোবাসা ও মানুষের বিশ্বাস।
ঘোপের সেই বাড়ি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং এক দুঃসহ স্মৃতি
তরিকুল ইসলাম চাচাকে ঘিরে আমার সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতিগুলোর একটি যশোর শহরের ঘোপ এলাকার আমাদের বাড়ি। আশির দশকের সেই উত্তাল সময়। দেশে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন চলছে। রাজপথে আন্দোলন, গ্রেপ্তার, নির্যাতন আর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় তখন দেশের পরিস্থিতি ছিল অস্থির।
আমার বাবা একরাম-উদ-দৌলার সঙ্গে তরিকুল ইসলাম চাচার ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই-বড় ভাই সম্পর্ক। বাবাকে তিনি ভীষণ ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন। আমার বাবা সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থাকায় আমাদের বাড়িকে তিনি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেও বিবেচনা করতেন। আন্দোলনের কঠিন সময়ে তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আত্মগোপনে থাকতেন।
একটি দৃশ্য আজও চোখের সামনে ভাসে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ক্রাচে ভর দিয়ে গভীর রাতে তিনি আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমার বাবা ও তরিকুল ইসলাম চাচা একই ঘরে, একই খাটে রাত কাটাতেন। রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তাঁদের সেই পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম।
সেই সময়ের অনেক কিছুই আজ স্মৃতির পাতায় ঝাপসা হয়ে এসেছে। কিন্তু ক্রাচে ভর দিয়ে গভীর রাতে বাড়িতে আসা মানুষটির মুখটি আজও ভুলতে পারিনি। তখন বুঝিনি, একজন রাজনীতিকের জীবনে কতটা ত্যাগ, কতটা ঝুঁকি আর কতটা নিঃসঙ্গতা লুকিয়ে থাকে। বড় হয়ে বুঝেছি, রাজনীতি তাঁর কাছে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছিল না; ছিল আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা।
আমাদের পরিবারের নানা দুঃসময় ও দুর্যোগেও তিনি পাশে থেকেছেন। সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন। সম্পর্কের সেই আন্তরিকতা কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা ছিল তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য

তরিকুল ইসলাম নিজেও সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাঁর নিজস্ব প্রকাশনা দৈনিক লোকসমাজ থাকলেও দলীয় সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আমার বাবা একরাম-উদ-দৌলার সম্পাদিত ও প্রকাশিত দৈনিক কল্যাণকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। দলীয় নেতাকর্মীদের বলতেন, সংবাদটি দৈনিক কল্যাণে পাঠাতে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পত্রিকাটিতে খবর প্রকাশিত হলে পাঠকের কাছে তা বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
এটি নিছক একটি পত্রিকাকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয় ছিল না; বরং সংবাদপত্রের প্রতি তাঁর আস্থা, সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান এবং সংবাদমাধ্যমের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধিরই প্রকাশ।
আমার পেশাগত জীবনে তাঁকে যত কাছ থেকে দেখেছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর ছিল সুসম্পর্ক। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের বক্তব্য শুনতেন, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা বুঝতেন।রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গায় তিনি সংকীর্ণতা দেখাতেন না।
একজন রাজনীতিকের জন্য সংবাদমাধ্যমকে ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, বরং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তোলাই যে গুরুত্বপূর্ণ—তরিকুল ইসলাম তাঁর আচরণের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই দিতেন।
সাংবাদিকতার ঝুঁকিপূর্ণ পথে তাঁর একটি বাক্য আজও সাহস জোগায়
আমার সাংবাদিকতা জীবনের একটি ঘটনা আজও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
প্রথম আলোয় ফটোসাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ ১৫ বছর কাজ করেছি। সেই সুবাদে ঢাকা অফিস থেকে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির জন্য জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা যশোরে আসতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আরিফুর রহমান দোলন, রাজীব নূর, শিশির মোড়ল ও আহমেদ জায়িফ। যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা অনিয়ম, প্রভাবশালী মহলের কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক গডফাদারদের নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কাজে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত থাকতাম আমি।
স্থানীয় সূত্র খুঁজে দেওয়া, তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো—এসব কাজে তাঁদের সহযোগিতা করতাম। কখনো দিন-রাত এক করে সংবাদের গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। পরে এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রথম আলোয় প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হতো।
কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ কখনো সহজ নয়। যাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হতো, তাঁদের অনেকেই আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসত, এমনকি জীবননাশের হুমকিও পেয়েছি।
একদিন ভয় আর উদ্বেগ নিয়ে তরিকুল ইসলাম চাচার বাসায় গেলাম। অন্য একটি কাজের ফাঁকে কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে নিজের আশঙ্কার কথা জানালাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর স্নেহভরা ভঙ্গিতে আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন—“ভয় করিস না বাবু…”
কথাটি ছিল খুবই ছোট। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার কাছে তা ছিল অনেক বড় আশ্বাস। একজন প্রভাবশালী রাজনীতিকের কাছ থেকে এমন সাহস জোগানো কথা পাওয়া একজন তরুণ সংবাদকর্মীর জন্য কতটা মূল্যবান, তা ভাষায় বোঝানো কঠিন।
তিনি আমাকে ভয় না পেয়ে নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে সাহস দিয়েছিলেন। তাঁর সেই আশ্বাস আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। আজও সাংবাদিকতার নানা প্রতিকূলতার কথা ভাবলে সেই কণ্ঠস্বর যেন কানে বাজে—“ভয় করিস না বাবু…”
একজন সাংবাদিকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! ক্ষমতাবান একজন মানুষ যখন সংবাদকর্মীর পাশে দাঁড়ান, তখন তিনি শুধু একজন ব্যক্তিকে সাহস দেন না; সাহস দেন স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চাকেও।
রাজনীতির কঠিন পাঠশালায় গড়ে ওঠা এক সংগ্রামী মানুষ
তরিকুল ইসলামের জীবন ছিল সংগ্রাম ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। মেধাবী ছাত্র হিসেবে যশোর জিলা স্কুল, মাইকেল মধুসূদন কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন।
ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে একজন সাহসী রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিত করে তোলে। এসব আন্দোলনে অংশ নিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতার পর যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনায় যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম সংগঠকে পরিণত হন।
১৯৭৯ সালে যশোর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে তাঁর যাত্রা শুরু। বিচারপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বিরোধী দলের রাজনীতি এবং ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় কারাবরণ—প্রতিটি অধ্যায়েই তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন কেবল মন্ত্রিত্ব, সংসদ সদস্যপদ কিংবা দলীয় পদ দিয়ে করা সম্ভব নয়। বরং প্রতিকূল সময়ে দলের পাশে থাকা, কর্মীদের আস্থা অর্জন এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থাকার মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে।
যশোরের উন্নয়ন, ক্রীড়া-সংস্কৃতি ও সংবাদপত্রের অঙ্গনে তাঁর পদচিহ্ন
তরিকুল ইসলামকে যশোরের মানুষ শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মনে রাখেননি। এ অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়াঙ্গন, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ও সংবাদপত্রের বিকাশের সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।
তিনি উপলব্ধি করতেন, একটি জনপদের উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট বা স্থাপনা নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সংবাদমাধ্যম এবং মানুষের সামাজিক বিকাশও উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।
তাঁর সঙ্গে সাংবাদিকদের সুসম্পর্কের অন্যতম কারণ ছিল এই বৃহত্তর উপলব্ধি। তিনি জানতেন, সংবাদপত্র একটি জনপদের ইতিহাস ধারণ করে, মানুষের কথা তুলে ধরে এবং সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে।
এ কারণেই যশোরের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু স্মৃতি আজও আলোচনায় আসে।
সাংবাদিকদের স্মৃতিতে তিনি কেন আলাদা?
একজন রাজনীতিকের সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক সাধারণত সংবাদ, বক্তব্য, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা প্রশ্নোত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু তরিকুল ইসলামের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। তিনি সাংবাদিককে কেবল সংবাদ সংগ্রহকারী হিসেবে দেখতেন না; দেখতেন সমাজের একজন দায়িত্বশীল অংশীজন হিসেবে।
তাঁর মধ্যে ছিল রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, সংবাদমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা। তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তেন আন্তরিকতায়, আস্থা রাখতেন তাঁদের পেশাগত দায়িত্বের ওপর।
আমার কাছে তরিকুল ইসলাম চাচার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর কাছে ভয় নিয়ে গেলে সাহস পাওয়া যেত, বিপদে পড়লে ভরসা পাওয়া যেত, আর পেশাগত দায়িত্ব পালনে দ্বিধায় পড়লে অনুপ্রেরণা পাওয়া যেত।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নানা মূল্যায়ন হতে পারে। তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা কিংবা মতপার্থক্যও থাকতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাঁর আন্তরিকতা, কর্মীদের প্রতি ভালোবাসা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

শেষ বিদায়: যশোরের আকাশে সেদিন নেমেছিল শোকের ছায়া
২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর। দিনটি যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে গভীর শোকের দিন হয়ে আছে। তরিকুল ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অসংখ্য মানুষ হারিয়েছিলেন তাঁদের প্রিয় একজন মানুষকে।
তাঁর মরদেহ যখন যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে আনা হয়, তখন সেখানে মানুষের ঢল নামে। ঈদগাহের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক ও আদালত চত্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল শোকাহত মানুষের সারি। জানাজায় অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড় সামাল দিতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হয়েছিল।
সেদিনের সেই দৃশ্য শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার জনপ্রিয়তার প্রমাণ ছিল না; ছিল দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের এক আবেগঘন বহিঃপ্রকাশ।
একজন মানুষ জীবদ্দশায় কতটা মানুষের হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, তাঁর বিদায়ের দিনে মানুষের উপস্থিতিই যেন তার সবচেয়ে বড় উত্তর।
শেষ কথা: কিছু মানুষ ইতিহাস হন, কিছু মানুষ হয়ে থাকেন স্মৃতি

আমি বিশ্বাস করি, তরিকুল ইসলামের জন্ম হয়েছিল নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য।তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক সময়ের প্রতিনিধি। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহস ও দূরদর্শিতা আগামী দিনের রাজনীতিকদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
আজ তিনি নেই। নেই ঘোপের সেই বাড়িতে গভীর রাতে ক্রাচে ভর দিয়ে আসা মানুষটি। নেই বাবার সঙ্গে একই খাটে রাত কাটানো সেই আপনজন। নেই আমার পিঠ চাপড়ে সাহস জোগানো মানুষটি। কিন্তু তাঁর বলা সেই একটি বাক্য—“ভয় করিস না বাবু”—আজও আমার স্মৃতির গভীরে জীবন্ত।
তাঁর সুযোগ্য সন্তান অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের রাজনৈতিক পথচলায়ও বাবার কিছু নেতৃত্বগুণ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখতে পাই। তবে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব পথচলা ও নিজস্ব অর্জন থাকে।
তরিকুল ইসলামকে সময়ের স্রোত মুছে দিতে পারবে না। কারণ তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। আর মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া মানুষদের মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁদের স্মৃতির মৃত্যু হয় না।
যশোরের মাটি, মানুষের ভালোবাসা, রাজনৈতিক ইতিহাস এবং সাংবাদিকদের স্মৃতিতে তরিকুল ইসলাম বেঁচে থাকবেন দীর্ঘকাল।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি প্রিয় তরিকুল ইসলাম চাচাকে।
মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।
লেখক : এহসান-উদ-দৌলা মিথুন,ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক
দৈনিক কল্যাণ




