নেতা থেকে জননেতা

0
তরিকুল ইসলাম: যশোরের মাটি ও মানুষের হৃদয়ে এক অবিস্মরণীয় নেতা

রাশেদ আব্বাস রাজ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরিচিত নাম তরিকুল ইসলাম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ ও সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যশোরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ‘যশোর উন্নয়নের কারিগর’ হিসেবে পরিচিত এক জননেতা। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং উন্নয়ন-প্রত্যাশার নানা অধ্যায়। যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে তাঁর কর্মময় জীবনের ছাপ আজও আলোচিত হয়।
যশোরের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়নে তরিকুল ইসলামের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ছাত্রীনিবাস, যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, কিশোর সংশোধনী প্রতিষ্ঠান, সিটি কলেজের বিজ্ঞান ভবন ও ছাত্রাবাস এবং যশোর কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে তাঁর উদ্যোগ ও সহযোগিতার কথা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন কালভার্ট, সেতু ও সড়ক নির্মাণেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায়ও তাঁর ভূমিকার কথা যশোরের মানুষ স্মরণ করেন।
ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু। প্রথমদিকে তিনি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ সালে যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজের শহীদ মিনার সংস্কারের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকারের রোষানলে পড়ে তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়।
১৯৭০ সালে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৭৩ সালে তিনি যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সালে পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভ করেন। একই বছর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলটির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সংগঠন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর সদর আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি মোট চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিএনপির রাজনীতিতে তিনি যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও ভাইস চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তাঁকে নানা প্রতিকূলতা, ভয়ভীতি, নির্যাতন ও কারাবরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এরশাদের সামরিক শাসনামলে তাঁকে আটক করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের দলীয় আদর্শ ও অবস্থানে অবিচল ছিলেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উদীচী হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছিল বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং নেতা-কর্মীদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রাম, সাংগঠনিক তৎপরতা ও দলীয় নেতৃত্বের এক দীর্ঘ অধ্যায়।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে মন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলের গুরুত্বপূর্ণ সংকট ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাঁর মতামত ও পরামর্শ গুরুত্ব পেয়েছে।
জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদ ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জানাজায় দল-মতনির্বিশেষে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দান ও আশপাশের সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। সেই দৃশ্য প্রমাণ করেছিল, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও তিনি বহু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
তরিকুল ইসলাম কেবল একজন দলীয় নেতা ছিলেন না; যশোরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, উন্নয়ন-প্রত্যাশার প্রতীক এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মারক। তাঁর কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক অবদান আগামী প্রজন্মের কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
এই জননেতার অষ্টম প্রয়াণবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও সশ্রদ্ধ সালাম। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন মরহুম তরিকুল ইসলামকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক, যশোর কলেজ ও সাবেক কাউন্সিলর।