তরিকুল ইসলাম: যশোরের জনজীবন ও সাংবাদিকতার স্মৃতিতে

0
তরিকুল ইসলাম: যশোরের জনজীবন ও সাংবাদিকতার স্মৃতিতে

তাসমীম জাহান জ্যোতি : যশোরের ইতিহাস, রাজনীতি ও জনজীবনের আলোচনায় তরিকুল ইসলাম একটি পরিচিত নাম। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; ছিলেন যশোরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এক জননেতা। রাজনৈতিক জীবন, জনসম্পৃক্ততা এবং সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহ—সব মিলিয়ে তিনি যশোরের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬২ সালে সহপাঠীদের নিয়ে যশোর এমএম কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয়। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর রাজনৈতিক পথচলা পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিস্তৃত হয়।

তিনি যশোর পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। যশোরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগের কথা আজও আলোচনায় আসে।
তরিকুল ইসলামের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় দৈনিক লোকসমাজ প্রতিষ্ঠা। তিনি ছিলেন পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশক। ১৯৯৬ সালের ৩০ অক্টোবর যাত্রা শুরু করা দৈনিক লোকসমাজ যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কথা, স্থানীয় সমস্যা, সম্ভাবনা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সমাজের বাস্তব চিত্র সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরার প্রত্যয় নিয়ে লোকসমাজের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করা আর তাকে মানুষের আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন দূরদৃষ্টি, জনসম্পৃক্ততা এবং গণমাধ্যমের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। তরিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠিত লোকসমাজের পথচলায় সেই প্রত্যয়ের প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর স্বপ্ন ও উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে পত্রিকাটি আজও পাঠকের কাছে স্থানীয় জনজীবনের নানা বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে যশোরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর কর্মময় জীবনের নানা দিক আজও আলোচনার দাবি রাখে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও অবদান তুলে ধরা প্রয়োজন, কারণ একজন মানুষের কর্ম কেবল তাঁর জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ থাকে না; সময়ের সঙ্গে তা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
তরিকুল ইসলামকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নয়; একই সঙ্গে যশোরের রাজনৈতিক ইতিহাস, জনজীবন এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের কথা বলার যে প্রত্যয় শুরু হয়েছিল, তা আরও দায়িত্বশীল ও জনমুখী সাংবাদিকতার প্রেরণা হয়ে থাকুক।
প্রয়াত তরিকুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।