মেধাবী তরিকুল ইসলাম

0
মেধাবী তরিকুল ইসলাম
প্রচ্ছদ : এহসান প্রতীক

এম. আইউব : ২০০৮ সালের কথা। তখন আমি দৈনিক পূর্বাঞ্চলের যশোর অফিসপ্রধান। আমার সঙ্গে আরও তিনজন সহকর্মী কাজ করতেন। ওই বছর ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট অংশগ্রহণ করে।
ওই নির্বাচনে যশোরের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে এক্সক্লুসিভ নিউজ করার দায়িত্ব দেন দৈনিক পূর্বাঞ্চলের সম্পাদক, শ্রদ্ধেয় প্রয়াত আলহাজ লিয়াকত আলী। সম্পাদকের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি একটি প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠাই। সেই প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী মরহুম তরিকুল ইসলামের নামও ছিল। দৈনিক পূর্বাঞ্চলের প্রথম পাতায় রঙিন শিরোনামে তিন কলামে আমার বাইলাইনে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। ঘটনাটি ২০০৮ সালের শেষ দিকের।
এরপর কেটে যায় প্রায় দুই বছর।
২০১০ সালে সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোরের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আমি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনালে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী শ্রদ্ধেয় তরিকুল ইসলাম।
পরিচয়পর্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অভিষেক অনুষ্ঠান। একপর্যায়ে আমার পরিচয় দেওয়ার পালা আসে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় দিই। নাম বলতেই শ্রদ্ধেয় নেতা তরিকুল ইসলাম আমাকে উদ্দেশ করে বলে ওঠেন, ‘এই, তুই না আমাকে নিয়ে পূর্বাঞ্চলে নিউজ করেছিলি? কেন করেছিলি?’
তাঁর এমন প্রশ্নে আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়ি। তখন দৈনিক লোকসমাজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শ্রদ্ধেয় আনোয়ারুল কবির নান্টু ভাই এবং দৈনিক সুবর্ণভূমির প্রধান সম্পাদক আহসান কবীর তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আইউবের কী দোষ! ওকে যদি অফিস থেকে অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়, তাহলে ও কী করবে! আপনি যদি লোকসমাজের কাউকে কোনো নিউজ করার জন্য অ্যাসাইনমেন্ট দেন, তাহলে তার কি কিছু করার থাকবে?’
তাঁদের কথা শুনে তরিকুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘তোরা আমার বটগাছ। তোরা-ই তো আমাকে আগলে রাখবি। আমি যেমন তোদের দেখে রাখি, তোরা আমাকে দেখে রাখিস।’
ঘটনাটি ছিল আমার কাছে বিস্ময়কর। প্রায় দুই বছর আগের একটি সংবাদ, সেই সংবাদে নিজের নাম থাকা এবং সংবাদটির প্রতিবেদকের পরিচয়—সবকিছুই তাঁর মনে ছিল! তাঁর এই প্রখর স্মরণশক্তি ও মেধা আমাকে সেদিন সত্যিই বিস্মিত করেছিল।
সেদিন আমার উপলব্ধি হয়েছিল, রাজনীতি করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মেধা, এরপর প্রজ্ঞা। এই দুটি গুণ ও সামর্থ্য না থাকলে রাজনীতিতে ইতিবাচক কিছু করা কঠিন। মরহুম তরিকুল ইসলামের মধ্যে এই দুইয়েরই সমন্বয় ছিল। এ কারণেই তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন, একাধিকবার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং যশোরবাসীর অভিভাবক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তরিকুল ইসলাম যে গণমানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছিল তাঁর জানাজায়। ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। শহরের অধিকাংশ সড়কও ছিল মানুষে পরিপূর্ণ। যশোরের ইতিহাসে এত বড় জানাজা আগে কেউ দেখেছেন কি না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছিলেন বলেই তাঁর বিদায়ে এমন জনসমাগম ঘটেছিল।
তরিকুল ইসলামের শূন্যতা যশোরের মানুষ আজও গভীরভাবে অনুভব করেন। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর মেধা, স্মরণশক্তি, ব্যক্তিত্ব ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের অসাধারণ ক্ষমতা তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।
মহান রবের কাছে প্রার্থনা, শ্রদ্ধেয় নেতা তরিকুল ইসলামকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক নতুন সকালের বার্তা।