তরিকুল ইসলামের রাজনীতি

0
মেধাবী তরিকুল ইসলাম
প্রচ্ছদ : এহসান প্রতীক
হারুন জামিল :

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ছিল উদার ও মধ্যপন্থার গণতান্ত্রিক রাজনীতি। ১৯৭২ থেকে ৭৫ সময়কালীন বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে এক চরম বিশৃঙ্খল পরিবেশে ক্যু পাল্টা ক্যুর মধ্যদিয়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যখন ছিল হুমকির মুখে তখন সিপাহী জনতা জিয়াউর রহমানকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। জিয়াউর রহমান উচ্চাভিলাসী ছিলেননা। ঘটনা পরম্পরায় ইতিহাস তাকে সামনে টেনে আনে। তাঁর রাজনীতির সফলতার সবচেয়ে বড় কারণ তিনি এদেশের জনমানুষের আকাঙ্খা বুঝতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের মত একটি সমস্যা জর্জরিত বিভাজিত এবং চরম বিদ্বেষপূর্ণ সামাজিক পরিবেশকে সংস্কারে হাত দিয়ে তিনি সফল হয়েছিলেন। এর কারণ ছিল তিনি ডান বামের বিপরীতে মধ্যপন্থার এমন এক রাজনীতির প্রবর্তন করেন যা সত্যিকারার্থে বাংলাদেশের জন্য ছিল সময়োপযোগী। তিনি সমাজে ভেদরেখা মুছে ফেলেছিলেন। সেনাজীবনের কঠোর শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের মূলমন্ত্র তাকে উজ্জীবিত করেছিলে দেশ গঠনে। তিনি এমন একদল মানুষকে সংগঠিত করেন যারা সে সময়ে ছিলেন বয়সে তরুণ। আবার অভিজ্ঞ এমন একদল প্রবীনকে তিনি খুঁজে বের করেন যাদের অভিজ্ঞতা দেশের জন্য ছিল খুবই প্রয়োজন। মরহুম তরিকুল ইসলাম ছিলেন জিয়াউর রহমানের বাছাইকৃত তরুণ নেতৃত্বের অন্যতম।
দীর্ঘসময় জননেতা তরিকুল ইসলামকে কাছে থেকে দেখা এবং তাঁর চিন্তাভাবনা ও রাজনীতির প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক ও সাচ্চা জাতীয়তাবাদী নেতা। তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে কোন বৈপরিত্য ছিলনা। দেশের স্বার্থ ছিল সর্বাগ্রে। মাথানত করে দাসখত দেয়ার রাজনীতিকে তিনি ঘৃণা করতেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রইউনিয়ন করতেন। কিন্তু এরপর কখনোই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। তিনি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অনুসারী ছিলেন। স্বাধীনতাত্তোরকালে তিনি কারাবরণ করেছেন। মনেপ্রাণে তিনি প্রগতিশীল ছিলেন। কিন্তু বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রতি শ্রদ্ধাপোষণ করতেন। তিনি বলতেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতি করতে হলে সহনশীল হতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা ছাড়া গণতন্ত্র হয়না। রাজনীতি ছিল তার রক্তে মেশানো। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি গণতন্ত্র স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। শত নিপীড়ন সত্ত্বেও তিনি জালিমের কাছে কখনোই মাথানত করেননি। তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশই কেটেছে কারাগারে। তিনি ভন্ডামির রাজনীতি পছন্দ করতেননা। বিএনপির অভ্যন্তরে ভিন্নমতের বিপরীতধর্মী লোকের সহাবস্থান ছিল। তরিকুল ইসলাম সবপক্ষের কাছে সমানজনপ্রিয় ছিলেন। তিনি কথামালার রাজনীতি করতেননা। যা বিশ্বাস করতেন অকপটে বলতেন। দলীয় ফোরামে সঙ্কটকালীন তাঁর মতামত প্রাধান্য পেতো। তিনি যা বিশ্বাস করতেন। তা বলে ফেলতেন। তিনি আজীবন একটি সুখি সমৃদ্ধ শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। বিএনপির বিভিন্ন সঙ্কটকালে তরিকুল ইসলামের ভূমিকা ছিলো সবার আগে। দলের নীতি ও আদর্শের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অনেকেই পথ হারিয়েছেন। তিনি কখনোই রাজনীতির বাঁকাপথে পা বাড়াননি। ষড়যন্ত্র ও কুটিল রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। জীবনযাপন করেছেন সাদামাটা আড়ম্বরহীন। সন্তানদেরকে দেশে রেখে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। তাদের মধ্যে মূল্যবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন। জীবনের শেষপর্যায়ে হাসপাতালে থাকাকালীন তাঁর দুই ছেলেকেই দেখেছি রাতযাপন করে পিতার পাশে থাকতে। তাকে সুস্থ করে তুলতে পুরো পরিবারকে নিয়ে দেশে-বিদেশে চিকিৎসকদের কাছে যেতে। এ যুগে অনেকটাই নজিরবিহীন। তার পারিবারিক জীবন ছিল যথেষ্ঠ পরিচ্ছন্ন। ব্যক্তিগত জীবন আর রাজনৈতিক জীবনকে তিনি পৃথক করেননি। এজন্যই তরিকুল ইসলামের রাজনৈতিক দর্শন অন্যদের চেয়ে আলাদা। বিএনপির রাজনীতি তার জীবনবোধ ও দর্শনকে প্রভাবিত করেছিল। এ কারণেই তরিকুল ইসলামকে বিএনপি থেকে কখনোই পৃথক করা যায়নি। ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে আমি মহান আল্লাহর কাছে তাঁরজন্য উত্তম প্রতিদান প্রার্থনা করি।