মোংলা বন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সফর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে প্রত্যাশা

প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল বাস্তবায়নের অপেক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা

0
মোংলা বন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সফর, অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- সংগৃহীত ছবি

আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট, লোকসমাজ : সরকার গঠনের আট মাসের মাথায় মোংলা বন্দর সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর এই সফরকে ঘিরে বন্দরটির সক্ষমতা বৃদ্ধি, অসমাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ, ড্রেজিং এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়নের উদ্যোগ আরও গতি পাবে।

স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো কোনো প্রধানমন্ত্রীর মোংলা বন্দর সফরকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তবে স্থানীয়দের কাছে এই সফরের গুরুত্ব রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশায় বেশি।

সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি, সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্ট এলাকায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল এবং প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শন করবেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের আশা, এ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে অসমাপ্ত জেটি নির্মাণ, ড্রেজিংসহ আটকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী বলেন, মোংলা বন্দরের যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর আগমন তা আরও ত্বরান্বিত করবে। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে।

অন্যদিকে, মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা পুনঃসংস্কারকৃত (রিকন্ডিশন্ড) গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক বলেন, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানির মাধ্যমে মোংলা বন্দরে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয়। তবে আমদানির ক্ষেত্রে বারভিডা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই বৈষম্য নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে হলে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দর চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধিতে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর এসব উদ্যোগকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করেন তিনি।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে মিছিল করেছে মোংলা উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মীরা।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় কাজ হারানো মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি মনে করেন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টায় প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসভবন থেকে সড়কপথে তেজগাঁও বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন। সকাল ৯টায় বিমানবন্দরে পৌঁছে হেলিকপ্টারে সুন্দরবনের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তিনি।

সকাল ১০টায় হেলিকপ্টার থেকে হিরণ পয়েন্ট ও সুন্দরবন এলাকা পর্যবেক্ষণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে লঞ্চঘাটে গিয়ে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে নৌপথে বাগেরহাটের বানৌজা মোংলার উদ্দেশে রওনা হবেন।

দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে বানৌজা মোংলার জেটিতে পৌঁছে ওয়ার্ডরুমের উদ্দেশে যাত্রা করবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ১টায় মধ্যাহ্নবিরতির কর্মসূচি রয়েছে। এ সময় খুলনার বিভাগীয় কমিশনার এবং খুলনা ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক উপস্থিত থাকবেন। পরে দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে ওয়ার্ডরুমের সভাকক্ষে আয়োজিত সভায় যোগ দেবেন তিনি।

বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শনের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেল ৩টায় জেটিতে পৌঁছে সেটি পরিদর্শন করবেন। এরপর বিকেল সোয়া ৩টায় প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। বিকেল সাড়ে ৩টায় ওই এলাকা পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।

সফর শেষে বিকেল ৪টায় হেলিপ্যাড থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর। বিকেল ৫টায় তাঁর ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। ইতোমধ্যে তাঁর পরিদর্শনের জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলোতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে।

এ ছাড়া সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি এসআরবি, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে।

সফরটি রাজনৈতিক সমাবেশকেন্দ্রিক না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী যেসব স্থানে যাবেন, সেখানে নেতাকর্মীদের বড় ধরনের জমায়েতের পরিকল্পনা নেই। নির্ধারিত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই মূলত উপস্থিত থাকবেন।

মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ। এখন তাঁদের অপেক্ষা—সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাগুলো বাস্তবায়নের পথে কতটা অগ্রগতি আসে।