দিলীপ আগরওয়ালা: ৬৭৮ কোটি টাকার লেনদেন ও জুলাই আন্দোলনের মামলা

0
দিলীপ আগরওয়ালা: ৬৭৮ কোটি টাকার লেনদেন ও জুলাই আন্দোলনের মামলা
সংগৃহীত ছবি

লোকসমাজ ডেস্ক: ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে স্বর্ণ ও হীরার ব্যবসায়িক লেনদেন, অর্থের উৎস এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়। ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার স্বর্ণ ও হীরার লেনদেনের উৎস নিয়ে অর্থপাচারের অভিযোগে করা মামলায় তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় এক আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে করা মামলাতেও তাঁকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় ২১ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

দুটি মামলার অভিযোগের ধরন আলাদা। একটিতে স্বর্ণ ও হীরার উৎস, সরবরাহকারী এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের বৈধতা খতিয়ে দেখছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অন্যটিতে জুলাই আন্দোলনের সময় এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দিলীপ আগরওয়ালার কথিত ভূমিকা তদন্ত করছে পুলিশ। কোনো মামলাতেই অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; তা নির্ভর করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের স্বর্ণ ও হীরার কেনাবেচা নিয়ে অনুসন্ধানের সূত্র ধরে দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করে সিআইডি। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার গুলশান থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করা হয়। মামলার বাদী সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুলশান অ্যাভিনিউয়ে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও কার্যালয়কে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট লেনদেন হয়।

এজাহারে সিআইডির অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে বৈধভাবে বিদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার, হীরা ও অন্যান্য অলংকার আমদানি করেছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনা, বিনিময় বা রূপান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির অভিযোগ, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা এসব পণ্যের বিক্রেতা ও মূল উৎস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এ কারণে পণ্যের একটি অংশ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে এসেছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এসব লেনদেনের অর্থের উৎস ও বৈধতা যাচাই করতেই মামলাটি করা হয়।

তবে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা পণ্যের নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং পুরো লেনদেনকে অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে পণ্যের উৎস, সরবরাহকারীর পরিচয়, আমদানি ও ক্রয়সংক্রান্ত দলিল এবং অর্থ পরিশোধের রেকর্ড যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।

গত ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ২০ অক্টোবর তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।

রিমান্ড আবেদনে মামলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা, স্বর্ণ ও হীরার উৎস শনাক্ত এবং অর্থপাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেয়। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন।

আদালতের আদেশের পর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার উৎস, সরবরাহকারীদের পরিচয়, লেনদেনের অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যথার্থতা।

দিলীপ আগরওয়ালার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায়। উত্তরা পশ্চিম থানায় ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ করা মামলাটির নম্বর ৫৭। এজাহারে তাঁকে ৩১ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও পুলিশের রিমান্ড আবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিএনএস সেন্টারের পশ্চিম পাশে আন্দোলনকারীরা অবস্থান করছিলেন। এ সময় দিলীপ আগরওয়ালাসহ অন্য আসামিরা সেখানে উপস্থিত হয়ে সশস্ত্র হামলা চালান এবং আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় মামলার বাদী আব্দুল জব্বার গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর কোমরের ওপরের অংশে, মেরুদণ্ডের নিচের দিকে গুলি লাগে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে সহ-আন্দোলনকারীরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে তিনি থানায় অভিযোগ করেন।

মামলায় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অভিযোগপত্র ও আদালতের নথিতে প্রযোজ্য ধারার সঠিক বিবরণ যাচাই করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. সুমন মিয়া দিলীপ আগরওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিলেন। আবেদনে ঘটনার সঙ্গে তাঁর কথিত সম্পৃক্ততা যাচাই, অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, তাঁদের পরিচয়-ঠিকানা সংগ্রহ এবং ঘটনার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।

তবে ২১ অক্টোবর ২০২৬ আদালত এ মামলায় দিলীপ আগরওয়ালার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অর্থাৎ, পুলিশের আগের ১০ দিনের আবেদনের বিপরীতে আদালতের সর্বশেষ আদেশে চার দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছে।

এই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল ও বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৩ সালে গঠিত দলটির উপকমিটিতে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একই বছর চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় আসে।

তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো বিশেষ সুবিধা বা অনিয়মের যোগসূত্র ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের বিষয় হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পদে থাকা বা কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার তথ্য নিজে থেকেই অপরাধ বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের প্রমাণ নয়।

এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো—ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বিধিবহির্ভূত সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, আমদানি-রপ্তানি ও শুল্কসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের প্রমাণ রয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন সরকারি নথি, আর্থিক দলিল, সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত এবং নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ।

দিলীপ আগরওয়ালাকে এর আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং ওই মামলায় তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও কয়েকটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এসব মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জামিন পান এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

আগের মামলাগুলোর অভিযোগ, বর্তমান দুটি মামলার অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কোনো মামলায় গ্রেপ্তার, রিমান্ড বা আসামি হিসেবে নাম থাকা নিজে থেকেই অপরাধ প্রমাণ করে না।

দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দুটি পৃথক তদন্তের বিষয় সামনে এসেছে। অর্থপাচারের মামলায় প্রধান প্রশ্ন হলো, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার প্রকৃত উৎস কী, সরবরাহকারীরা কারা এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের অর্থ কোথা থেকে এসেছে। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের মামলায় তদন্তের বিষয় হলো, ঘটনার সময় তাঁর উপস্থিতি ও কথিত ভূমিকার পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তা যাচাই করতে হবে নির্দিষ্ট তথ্য ও নথির ভিত্তিতে। রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে কোনো বিশেষ সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, সরকারি কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ঘিরে চলমান মামলাগুলোতে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণই এখন মুখ্য। তদন্তে পাওয়া তথ্য, প্রামাণ্য নথি এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর আইনগত অবস্থান স্পষ্ট হবে।