মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ : অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার

রেমিট্যান্সের নেপথ্যের মানুষগুলো এখন যুদ্ধের ঝুঁকিতে

0

শিকদার খালিদ, লোকসমাজ : 
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে। গাজা, লেবানন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতসহ পুরো অঞ্চলে প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় বাড়তে থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক। একই সঙ্গে বাড়ছে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কাও।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় চাপ পড়বে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ে। কারণ দেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে প্রাণহানির সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে। গাজা, লেবানন ও ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

চলমান সংঘাতে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত সাত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

সম্প্রতি লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় সাতক্ষীরার তিন বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। পরিবারগুলো বলছে, জীবিকার সন্ধানে যাওয়া মানুষগুলো এখন যুদ্ধের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন প্রবাসীর লাশ ফিরেছে দেশে।
মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা খাতেই সবচেয়ে বেশি কাজ করেন বাংলাদেশিরা। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
রেমিট্যান্সে চাপের শঙ্কা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান কমে গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের বর্তমান শ্রমবাজারের রিস্কগুলো নিয়ে একটা মূল্যায়ন করতে হবে। এটা নিয়ে এক ধরনের ছোটখাটো গবেষণা হতে পারে। কারণ আমরা মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক বছর ধরে উত্তেজনাটা বেশি দেখছি। আর যেকোনো জায়গাতেই এটা হতে পারে।
বিকল্প শ্রমবাজারে নজর
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির আরও বলেন, নতুন জায়গায় বাজার খোঁজার জন্য একটু মনোযোগী হতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকেই সেই সুযোগ আসতে পারে। আমাদের কাছাকাছিও কিছু কিছু আছে। জাপান ইতোমধ্যেই লোকজন চাচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে। এগুলো ধরার জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাটার দিকে একটু বেশি করে নজর দিতে হবে।
পাশাপাশি যুদ্ধকবলিত দেশে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপত্তায় দূতাবাসগুলোর জরুরি সহায়তা সেল আরও সক্রিয় করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে বিকল্প নতুন শ্রমবাজারের সন্ধানে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান।
এ সময় তিনি বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশ মোতাবেক প্রয়োজন অনুসারে দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করাসহ সরকারের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল, রাশিয়া ইত্যাদি নতুন দেশগুলোয় বিকল্প শ্রমবাজার সম্পসারণে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কর্মী নিয়োগকারী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের সফরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। থাইল্যান্ডে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের জন্য কাজ চলছে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের সুপারিশে প্রয়োজন অনুসারে দেশভিত্তিক স্থানীয় লবিস্ট বা বিশেষজ্ঞ ফার্ম নিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এ মাসের ৮-১১ তারিখ দেশটি সফর করেছেন। এর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে।
অপরদিকে বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজতে ইউরোপের ৭টি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। দেশগুলো হচ্ছে— সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল ও রাশিয়া। গত ১৮ এপ্রিল বিকেলে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কবরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।