বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও গণমাধ্যম

0
বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ও গণমাধ্যম
মোহন হাসান

loksamaj-aniversaryবুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ মানুষের চিন্তা ও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। যারা লেখাপড়া শেখেন, জ্ঞান-সাধনায় সমর্পিত হন, তারা কখনই ক্ষুদ্র বৃত্তের মাঝে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে পারেন না। জ্ঞানের আলো ব্যক্তি থেকে পরিবারে, পরিবার থেকে সমাজে, অজস্র মানুষের মাঝে সূর্যের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
সূর্যকে ঢেকে রাখা যায় না। সে আজ হোক-কাল হোক, মেঘ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেই। মেঘের মতো কুপমন্ডুকরাও পারে না জ্ঞানের উন্মেষ ঠেকাতে। জ্ঞানীরা ঠিকই সমস্ত বাধা-বিপত্তি ঠেলে যথাসময়ে গন্তব্যে হাজির হন। যেমন গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসকে যারা বিষ পান করিয়ে হত্যা করেছিল, প্লেটোকে যারা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল, তারা কেউই সফল হতে পারেনি, শেষমেষ জ্ঞান ও পান্ডিত্যেরই জয় হয়েছে। ইতিহাস সক্রেটিস-প্লেটোদের কথাই মনে রেখেছে, কূপমন্ডুকরা চিরতরে হারিয়ে গেছে। যারা জ্ঞানকে মূল্য দেয় না, যাদের কাছে সততা, পান্ডিত্য ও প্রতিভার চাইতে শঠতা-ভন্ডামীর কদর বেশি, তাদেরকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না ইতিহাসের।
সময়ের মূল্যায়নে, সভ্যতার স্বীকৃতিদানে, নেতৃস্থানীয় মানুষের স্থান নির্ধারণে ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর-নির্দয়। সে আপন-পর কিংবা আঞ্চলিকতা বোঝে না, যার যেখানে থাকা উচিত– সেখানেই জায়গা করে দেয়।
ইতিহাসের মতো সমাজকেও নিয়ম মেনে চলতে হয়, জ্ঞান ও পান্ডিত্যের কদর করতে হয়। এর ব্যতিক্রম হলে সমাজ বিকশিত হতে পারে না, বরং পদে পদে তাকে হোঁচট খেতে হয়, মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। সমাজ হলো জনসমষ্টি, মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সমাজ গড়ে তুলেছে। ফলে মানুষের কল্যাণের প্রশ্নে সমাজের দায়িত্ব বিরাট। তাকে সকল শ্রেণীর, সকল পেশার মানুষের কথাই ভাবতে হয়, কার কোথায় অবস্থান সেটা তাকেই নির্ধারণ করে দিতে হয়। এই নির্ধারণে কোনো রকম গরমিল কিংবা জটিলতা দেখা দিলে বিরূপ প্রতিক্রিযা দেখা দেয়। সামাজিক বিন্যাসে গরমিল যতো বড় হয়, জটিলতা যতো তীব্র হয়, বিরূপ প্রতিক্রিয়াও ততো ভয়ংকর হতে বাধ্য।
সমাজ, রাষ্ট্র, ইতিহাস কেউই অনিয়মকে সহ্য করে না। ফলে প্রত্যেক মানুষেরই উচিত নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, নিয়ম মেনে চলা। প্রত্যেক মানুষ তার জীবনে জগতের-সমাজের-রাষ্ট্রের নিয়ম-কানুন মেনে চলার জ্ঞানটুকু রপ্ত না করলে পতন অনিবার্য। বিশ্বের বহু দেশ অর্থ-বিত্তে, জ্ঞান-গরিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, আবার বহু দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ভেবে দেখা যায়, এশিয়ার অন্যান্য দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের পাঁচ বছর পর স্বাধীন হওয়া ভিয়েতনামের তুলনায় আমরা কেন নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে পারিনি? দেশটির মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ২০০ ডলার। আর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬০০ ডলার। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থনীতি ও শিল্পায়ন উভয় ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। ভিয়েতনামের রফতানি আয় ৩৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর বাংলাদেশের রফতানি আয় মাত্র ৪৮ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের এই পিছিয়ে পড়ার কারণ বোধকরি পাটিগণিতের মত যোগ-বিয়োগ, গুণ-ভাগ করে দেখানোর দরকার পড়ে না। বস্তুত, সততা আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের অভাবই আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির বড় বাধা।
মানুষ তার জীবনের প্রতিটি স্তরে অর্জিত জ্ঞান রপ্ত করলে অসৎ পথে ভুলেও পা বাড়ায় না, নীতিহীন হতে পারে না। যারা সৎভাবে জীবনযাপন করেন, রাষ্ট্রের-সমাজের নিয়ম-কানুন মেনে চলেন, তারা যতো বড়ই চাকুরে কিংবা ব্যবসায়ী হন- আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে তাদের পক্ষে অল্প সময়ে অঢেল-সম্পত্তির অধিকারী হওয়া সহজ নয়। অল্প কিছু লোকের বিলাসবহুল জীবনযাপনের অর্থ রাষ্ট্রের ভাল থাকা নয়, সমাজের সুস্থ থাকা নয়। বরং এটা বড় অশুভ লক্ষণ, কারণ- এই কিছু লোকের বিলাসিতার খোরাক যোগাতে গিয়েই দুর্বিপাক নেমে আসে গোটা জনগোষ্ঠীর জীবনে। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে কোনো সমাজ, কোনো রাষ্ট্র সুন্দর-সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে না, আমরাও পারছিনা। সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী সবকিছুই বুঝছে, দেখছে কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্রে অশিক্ষিত, অসৎ, শঠ লোকদের প্রাধান্য ও দৌরাত্ম্যের কারণে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় আমরা পেছনে পড়ে আছি। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করলে এটাই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, হাবোড়ে পড়ে যাওয়া হাতির মতো পা টিপে টিপে শক্ত মাটি খুঁজছে এই জনগোষ্ঠী। হাতি হারে মানুষ কখনো হারে না; আজ হোক-কাল হোক, শক্ত মাটির ওপর তারা দাঁড়াবেই। এই শক্ত মাটির জন্যেই মানুষ যুদ্ধ করে, রক্ত দেয়, বেঁচে থাকে। মর্যাদা সহকারে বেঁচে থাকার প্রশ্নে মানুষের সংগ্রাম কখনই থেমে থাকে না, একটু একটু করে মানুষ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায়। অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই তার জন্ম। জ্ঞানের আলো মানুষকে যে পথ দেখায় সে পথে মানুষ ধাবিত হবেই, পৃথিবীর কোনো শক্তি তাকে রুখতে পারে না।
জ্ঞানার্জন ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছিলেন, যে জাতির জ্ঞানের ভান্ডার শূন্য, সে জাতির ধনের ভান্ডারেও ভবানী’। দেশের গরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী যখন সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত হবে,
জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে- তখন আর সামাজিক বিন্যাসে কোনো গরমিল
দেখা দেবে না, মুষ্টিমেয় অসৎ লোক সেই সুযোগও পাবে না। শিক্ষিত মানুষ তার অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন। রাষ্ট্রের প্রতি একজন নাগরিকের কি কর্তব্য এবং একজন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের কি দায়িত্ব, সেটা সকল শিক্ষিত সচেতন লোকই জানে। তবে সকলে নিশ্চয় তা মেনে চলে না।
অশিক্ষা-কুশিক্ষার কারণে একে অপরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। গোটা জনগোষ্ঠী যখন শিক্ষিত হবে তখন সুবিধাভোগী লোকদের পায়ের নিচ থেকে অবশ্যই মাটি সরে যাবে। দেশ ও জাতিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে হলে সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে, জ্ঞানকে মূল্য দিতে হবে। সন্দেহ নেই, জ্ঞানচর্চা বা বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের অন্যতম প্রধান একটি ক্ষেত্র হচ্ছে, গণমাধ্যম। ফলে এই ক্ষেত্রটি স্বাধীন ও সুস্থ ধারায় না চললে বা না চলতে পারলে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির যেমন বিকাশ ঘটে না, তেমনি গড়ে উঠতে পারে না সত্যিকারের আলোকিত সমাজ ও রাস্ট্র।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক দিনকাল। জীবনসদস্য: বাংলা একাডেমি