আয়নায় মফস্বল সাংবাদিকতা

0
আয়নায় মফস্বল সাংবাদিকতা
হাবিবুর রহমান রিপন

loksamaj-aniversaryমোজাফফর পেশায় একজন সাংবাদিক। থাকেন এক মফস্বল শহরে। স্থানীয় একটি আঞ্চলিক পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি ঢাকার একটি নামকরা টিভি চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয়পত্র ঝোলান গলায়। স্থানীয় পত্রিকা থেকে মাস শেষে যে বেতন বা সম্মানী পান, তা বর্তমান বাজারের তুলনায় হাস্যকর বললেও কম বলা হবে। সেই টাকায় যাতায়াতের ভাড়া আর বিড়ি-সিগারেটের খরচই ঠিকমতো ওঠে না। সংসারের চাল-ডাল, ওষুধপত্র, বাচ্চার জামাকাপড় কিংবা বাড়ি ভাড়ার জোগাড় করতে তাই অন্য পথের সন্ধান করতেই হয়।
অনেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেন, কেউবা ছোটখাটো ব্যবসায় কিছু পুঁজি খাটিয়ে মাসে মাসে কিছু মুনাফা পান। কিন্তু মোজাফফরের সে রকম কোনো সুযোগ নেই। সে না শিক্ষক, না ব্যবসায়ী। ফলে সৎ উপায়ে সংসার চালানোর পথ খুঁজতে তাকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়।
সাংবাদিকদের জন্য বিজ্ঞাপন নাকি খুবই বৈধ একটি আয়ের উৎস! মোজাফফরও শেষমেশ সে পথেই হেঁটেছিল। এক শুভাকাঙ্ক্ষীকে অনুরোধ করে একটি বিজ্ঞাপন জোগাড় করল, পত্রিকায় ছাপাও হলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটল পরদিন। সেই শুভাকাঙ্ক্ষী মোজাফফরকে ডেকে বললেন, “ভাই, আপনাকে আর বিজ্ঞাপন দিতে হবে না। আপনি বরং মাস শেষে আমার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে যাবেন।” মোজাফফর তো হতাশ! ভুলটা কোথায় হলো জানতে চাইলে তিনি হেসে বললেন, “আপনার কোনো ভুল নেই ভাই, সময়টাই খারাপ। আজ সকাল থেকে ১০-১২টি ফোন পেয়েছি বিজ্ঞাপনের জন্য। এমনকি আপনার অফিসের এক কর্মকর্তাও ফোন করেছেন। তাই ঠিক করেছি বিজ্ঞাপন না ছাপিয়েই আপনাকে টাকাটা দেব।” মোজাফফরের কাছে ওটা অনুদান বা দান মনে হলো। আত্মসম্মানে বাধায় সে টাকা সে নিল না। ফলে বিজ্ঞাপনের বৈধ পথটাও বন্ধ হয়ে গেল।
এরপর বিকল্প হিসেবে মোজাফফর ভাবল বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করার কথা। মফস্বলে কিছু অনুষ্ঠানে গেলে আয়োজকরা ভালোবেসে দুই-চারশো টাকা হাতে ধরিয়ে দেন। মোজাফফর ঠিক করল বেশি বেশি অনুষ্ঠানে যাবে। কিন্তু সেখানেও বাঁধসাধল বাস্তবতায়। অফিস থেকে তো আর প্রতিদিন এত অ্যাসাইনমেন্ট মেলে না, আবার সব অনুষ্ঠানে টাকাও পাওয়া যায় না। হাতে গোনা দু-একজন নিজ ইচ্ছায় দেন, আর বাকিদের কাছে চাটুকারের মতো হাত না পাতলে কিছুই মেলে না। দিন দিন সাংবাদিকের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বলে অনুষ্ঠানের সম্মানীর অঙ্ক কমছে। মোজাফফর বুঝল, এটি আর সৌজন্য উপহারের পর্যায়ে নেই, এ যেন হাত পাতা। এ পথও বন্ধ।
অথচ একই শহরে মোজাফফরের চোখের সামনে সুট-বুট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সবদুল। সে কখনো একটা ভালো খবর লিখেছে বা সংবাদের জন্য প্রশংসিত হয়েছে—এমনটা কেউ শোনেনি। কিন্তু শহরের সবাই জানে সবদুলের আসল কাজ ‘মুরগি ধরা’। প্রতিদিন কোনো না কোনো মানুষকে টার্গেট করা, তার দুর্বলতা বা অপকর্ম খুঁজে বের করা, আর তারপর পুলিশের মতো জেরা করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া—এটাই সবদুলের সাংবাদিকতা। এদের একটা নিজস্ব সিন্ডিকেট আছে। এদের কাছে নিউজের মানেই হলো ‘নতুন মুরগির সন্ধান’। এমনকি যেসব অফিসে তারা কাজ করে, সেখানকার মালিকরাও চান প্রতিনিধিরা মুরগি ধরে ধরে খাক আর সেখান থেকে একটা ভাগ অফিসেও পাঠাক।
মফস্বলে আজ লেখালেখির কোনো মূল্য নেই। ভালো সাংবাদিকের চেয়ে ভালো চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ, তোষামোদকারী আর তদবিরবাজ সাংবাদিকদের কদর ও দাপট বহুগুণ বেশি। দিনকে দিন প্রকৃত সাংবাদিকতা বিলীন হয়ে ঠেকেছে ‘মুরগিবাদে’।

আয়নায় মফস্বল সাংবাদিকতা

সংবাদপত্রের মালিকদের অবস্থাও বেশ। কাগজপত্র আর ওয়েজবোর্ডের আইনি ঝামেলা ঠিক রাখতে তারা চমৎকার কৌশল বের করেছেন। যেমন—একজন সাংবাদিকের খাতাকলমে বেতন ৩৩ হাজার টাকা। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ৩৩ হাজার টাকাই ঢোকানো হয়, কিন্তু আগেই তার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকার অগ্রিম চেক সই করিয়ে রাখা হয়। অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ঢোকার পরপরই ৩০ হাজার টাকা কেটে নেন মালিক। অর্থাৎ দিনশেষে সাংবাদিকের প্রকৃত বেতন মাত্র ৩ হাজার টাকা! অথচ খাতাকলমে ৩৩ হাজার টাকার বেতনের ঢেকুর তুলে সমাজে বেশ ‘সম্মানিত’ হয়ে ঘুরছেন তারা।
আরেক দল আছে ফজর আলীদের মতো। নামের আগে বড় বড় অক্ষরে লেখেন ‘সাংবাদিক’। কাউকে ফোন দিয়েই হাঁক ছাড়েন, “আমি সাংবাদিক ফজর আলী বলছি। আপনার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে, আমরা তদন্তে আসছি। কাগজপত্র রেডি রাখেন!” তারপর শুরু হয় ভয় দেখানো, হেনস্তা আর ব্ল্যাকমেইল। গভীর রাতেও এরা সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর ‘সোর্স’ হিসেবে গোপন অভিযানে অংশ নেন। ফজর আলীদের নিজস্ব খবর পত্রিকায় ছাপাতে নাকি উল্টো অফিসকে টাকা দিতে হয়! সঙ্গে আছে তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেজের দাপট। সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই ফজর আলীদেরই চেনে ‘আসল সাংবাদিক’ হিসেবে। ফলে ফজর আলীরা বুক ফুলিয়ে ঘোরেন, আর সত্যনিষ্ঠ লেখিয়ে সাংবাদিকরা মাথা নিচু করে চলেন। কারণ, মোজাফফরদের প্রতিদিন ঘর থেকে বের হতে হয় সংসারের খাবারের চিন্তা নিয়ে, বেঁচে থাকার অর্থের যোগান খুঁজতে।
হাতে গোনা যে দু-একজন মোজাফফর সততার নীতি ধরে রাখতে চান, শেষমেশ তারাও আর টিকতে পারেন না। পেটের টানে, পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে একসময় তারাও আদর্শের জোয়াল কাঁধ থেকে নামিয়ে রাখতে বাধ্য হন। কোনো প্রভাবশালী নেতার মাসোহারার তালিকায় কিংবা বিশেষ কোনো মহলের গোপন খাতার আনুকূল্যে তাদের নাম লেখাতে হয়।
একদিন হঠাৎ করেই মফস্বলের সাংবাদিক পাড়ায় ও প্রেসক্লাবে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে যায়। কানাঘুষা শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত মোজাফফরও ওই নেতার দয়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে! এই খবর চাউর হতেই একশ্রেণির মানুষের চোখে মোজাফফরের নৈতিকতার পতন নিয়ে শুরু হয় ফিসফাস।
এদিকে, এই খবর শোনার পর সংবাদপত্রের মালিক বা সম্পাদক মহোদয় মুচকি হাসেন। তাদের অন্তরে এক ষোলো আনা স্বস্তির সুখানুভূতি কাজ করে। মনে মনে তারা বেজায় খুশি— যাকগে, এখন আর এই মোজাফফরকে পকেট থেকে কোনো বেতন বা সম্মানী দিতে হবে না! দুর্নীতি আর তোষামোদের এই ঘূর্ণাবর্তে গা ভাসিয়ে দিয়ে সে এখন নিজের রুটি-রুজি নিজেই জুটিয়ে নেবে, আর বিনিময়ে মালিকপক্ষ তাকে ব্যবহার করবে নিখরচায় এক অনুগত হাতিয়ার হিসেবে।
আয়নায় ভেসে থাকা মফস্বল সাংবাদিকতার এই নির্মম চিত্রটি কিন্তু কেবল মোজাফফরের একলার জীবনের কোনো ব্যক্তিগত গল্প বা ব্যর্থতা নয়। এটা আসলে আমাদের চারপাশের পুরো নীতিহীন ও ভঙ্গুর মফস্বল মিডিয়া জগতের এমন এক বিষাক্ত দুঃস্বপ্ন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ রাস্তা আজ হয়তো আর কারো জানা নেই। জানা থাকলেও তা প্রকাশ করার সাহসটুকু রাখে না কেউ। সাংবাদিকদের রুটিরুটি নিশ্চত করার মহান দায়িত্ব দিয়ে গড়ে ওঠা সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো এখন মনে করতে পারে না তাদের কাজ কী। দলনীতি, তোষণনীতিতে ঢাকা পড়েছে তাদের বিপ্লব বিদ্রোহ। নেতারা কিছু সুবিধা পায় হয়তো, আর কর্মীদের জোটে বার্ষিক পিকনিকে এক বেলা পেটপুজো, ঈদে এক প্যাকেট বাজার বা নগদ টাকা অথবা সরকারি অনুদান। এতেই বেশ খুশি সবাই। দলে দলে যোগদিচ্ছে ক্ষমতাসীনদের কাছাকাছি থাকা ইউনিয়নে। রাজনৈতিক বিভাজনও সাংবাদিকতাকে পেরকে মেরে দলের আনুগত্যের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিচ্ছে।
এইসব সংকটের মূলে রয়েছে সংবাদপত্রের মালিকদের অমানবিক ব্যবসা আর নীতিহীন আচরণ। নামমাত্র সম্মানী দেওয়া, মাসের পর মাস বকেয়া রাখা, কিংবা ব্যাংকে পুরো টাকা পাঠিয়ে পরক্ষণেই ফাঁকা চেক দিয়ে তা তুলে নেওয়ার মতো জালিয়াতি আজ মফস্বলে খুব স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালিকরা ভালো করেই জানেন, পেটের ক্ষুধা মেটাতে প্রতিনিধিরাই শেষমেশ ‘মুরগি ধরা’ কিংবা তোষামোদের পথ খুঁজে নেবে—তাতে প্রতিষ্ঠানের খড়কুটোও খরচ হবে না, অথচ কাজ ঠিকই হাসিল হবে। আর এই নোংরা সুযোগটাই কাজে লাগায় ফজর আলী এবং সবদুলদের মতো ধান্ধাবাজরা। ফলে ভালো ও সত্যনিষ্ঠ লেখিয়ে সাংবাদিকরা সমাজ ও অফিসের কাছে দিন দিন মূল্যহীন কোণঠাসা হয়ে পড়েন, আর চাঁদাবাজরা সুট-বুট পরে দাপিয়ে বেড়ায় শহরময়।
সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, এই দীর্ঘমেয়াদী পচন থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সদিচ্ছা রাষ্ট্র বা সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেই। দিন যত যাচ্ছে, মফস্বলে স্বাধীন ও সৎ সাংবাদিকতার সেই উজ্জ্বল দিনগুলো ততটাই কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে। যদি না গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ তাদের নৈতিক দায়িত্বটুকু বোঝেন এবং সাংবাদিকদের ন্যূনতম সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দেন, তবে সাংবাদিকতা হারিয়ে যাবে নীতিহীনতার অতল গহ্বরে; আর আমরা আয়নায় দেখতে পাব সাংবাদিকতার লেবাস পরা একদল ধূর্ত কিংবা ধান্ধাবাজ মানুষের মুখ।