ক্ষমা মাহমুদ
এক রোদ ঝলমলে সকালে যখন হাসিমুখে হ্যানয়ের নোয় বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমেছি তখনও বুঝিনি আমরাই গ্রীক পুরাণের বার্তাবাহক দূত হার্মিস হয়ে এক দুরন্ত টাইফুন ‘ইয়াগি’র বার্তা নিয়ে এ দেশে ঢুকেছি আর তাতে, রোদ ঝলমল সেই সকাল পরবর্তী দুদিনের জন্যে একদম হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। সেই বার্তা পেয়েই কিনা, আমরা হ্যানয়ে পা দেয়া মাত্রই দক্ষিণ চীন সাগর ফুসে উঠলো আর আমাদের দিকে পাঠিয়ে দিলো উল্টোদিকে মুখ করে থাকা সাইক্লোন ‘ইয়াগি’কে । সেই ধাক্কায় আমাদের, মানে আমি আর আমার মেয়ে অমৃতার পুরো ভিয়েতনাম সফরই হয়ে পড়লো বেশ এলোমেলো!
এয়ারপোর্টে নেমেই চোখে পড়লো লেখা আছে, ‘হ্যানয়, শান্তির এক শহর’, – কিন্তু আমাদের শান্তি হলো না। প্রায় এক ঘন্টা সময় ইমিগ্রেশনের নানান বেতালে নষ্ট হয়ে গেল। স্টিকার ভিসাধারীরা, যাদের অধিকাংশই সাদা, আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেলেও এ্য্যাপ্লিকেশন ভিসাধারীদের নাচা হলো না! ইমিগ্রেশনে যারা কাজ করছে তাদের কচ্ছপ গতি দেখে যারপরনায় হতাশ হলাম, লোকবলও খুব কম। কোথায় আমাদের ঠিক কি করতে হবে সেসব দিক নির্দেশনাও পরিষ্কারভাবে কোথাও নেই- তার উপর ভাষার কিছুটা সমস্যা তো রয়েইছে। ইংরেজীর অবস্থা তথৈবচ। অগত্যা একে ওকে জিজ্ঞেস করে সব কিছু ঠিকঠাক করতে ঘন্টা পার হয়ে গেল। আমাদের গাইড বাইরে অপেক্ষায় আছে, তার সাথে আমাদের আজকে কয়েকটা জায়গা যাওয়ার প্ল্যান রয়েছে। বিদেশের মাটিতে এক ঘন্টা সময়ও ভীষণ মূল্যবান আর সেই মূল্যবান সময় যদি এসবের পেছনে নষ্ট হয় তাহলে মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু এসবই ভ্রমণের অবধারিত অংশ, বলাই বাহুল্য! আমাদের দেশি ট্রাভেল এজেন্টরা নিয়মিত এই পর্যটন ব্যবসা করে অথচ বাস্তবে এখানে নেমে তার ক্লায়েন্টরা কি সমস্যায় পড়ে, প্লেন থেকে নামার পরে সেসবের আর কোন খবর তারা রাখেনা। তারা যদি ছোট একটা ট্যুর ফিডব্যাক রাখে তাহলে পরবর্তীতে তাদের নতুন ক্লায়েন্টরা সেসব সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেতে পারে কিন্তু কোথাও কোন মানুষ এই দায়িত্বগুলো অনুভব করেনা। ছোট ছোট এই ব্যাপারগুলো খেয়াল করলে বরং তার ব্যবসার সুনাম বৃদ্ধি পাওয়ারই কথা। বাঙালী ব্যবসাটা কবে যে আর ঠিকঠাক মতো শিখবে!
শেষ ধাক্কাটা খেলাম যখন পাসপোর্ট সাইজের ছবি চাইলো আর আমি খুঁজে পেতে তা দিতে পারলাম না। ছবি আমার সাথে থাকেও সবসময় কিন্তু যা ঘটে আর কি, এমন যত্ন করে রেখেছি যে প্রয়োজনের এই মুহূর্তে ব্যাগের ফাঁকফোকর তল্লাসী করেও সে রত্নের হদিস মিললো না। এখানে এই ফটক এদের কি কাজে লাগে কে জানে! পরে ঠিকই ব্যাগের এক চিপা থেকে সেই ফটক উদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু কিছুটা হেনস্থা না হলে আর কিসের ভ্রমণ! ফটো না থাকার অপরাধে নারী অফিসার ছবি তুললেন তার ক্যামেরা দিয়ে, আর দুজনের পঞ্চাশ ডলার ভিসা ফির সাথে আরো চার ডলার নিয়ে নিলেন ছবি তোলার ফি বাবদ। ভিয়েতনামে ঢুকতে না ঢুকতেই এতগুলো অর্থদন্ড দিয়ে মেজাজটা তাই কিছুটা খিঁচড়েই গেল বলা যায়। পরে অবশ্য দেখেছি এটা তাদের নিয়মেই রয়েছে। অবশ্য সেই মুহূর্তে, সম্ভব হলে ডলার আরো একটু বেশি দিয়েও আমরা বের হয়ে আসি, আমাদের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। যাহোক বের হয়েই আমাদের গাইডকে পেয়ে গেলাম। বেশ মনমতো একটা বড় গাড়িতে আমাদের উঠিয়ে নিয়ে ভিয়েতনামের এক হাজার বছরের পুরনো শহর হ্যানয়ের রাস্তায় শুরু হলো আমাদের যাত্রা।

এয়ারপোর্ট থেকেই পুরো রাস্তা খুব সবুজ। একটু পরেই বিশাল এক ব্রীজ পাড়ি দিতে হলো, সাইনবোর্ড দেখে বুঝলাম চৌ আউ নদী পার হচ্ছি, নদীব তুলনায় ব্রীজ মনে হলো অনেক বড়! রাস্তায় নামতেই একটা চোখের আরাম শুরু হয়! অচেনা জায়গার সবকিছুতেই ভ্রামণিকদের কৌতুহলী চোখ নেচে ওঠে, মুহূর্তেই রাশি রাশি ছবি তোলা শুরু হয় মনের ক্যামেরায়, হাতের ক্যামেরাও কম যায় নাকি! কিছুক্ষণ আগের তিরিক্ষি মেজাজ, লম্বা পথযাত্রার ক্লান্তি ভোঁজবাজির মতো সব মিলিয়ে গেল অচেনা রাস্তায় চোখ রেখে!
যাচ্ছি সোজা আমাদের হোটেলের দিকে। সেখানে অল্প সময় একটু জিরিয়েই আমাদের আবার বের হওয়ার কথা রয়েছে। পথ চলতে চলতে কিছুদূর পরপর চোখে পড়ছে বাড়িঘরের মাথায়, দোকানের একপাশে লাঠির ডগায়, গাড়ির বনেটে, লাল পতাকা পতপত করে উড়ছে। এই প্রথম কোন সমাজতান্ত্রিক দেশে পা রাখলুম! ভীষণ কৌতুহল, দেখবো ঘুরে ঘুরে কেমন চলছে বিপ্লবী নেতা হো চি মিনের ভিয়েতনাম। কতকিছু পড়েছি এই দেশ নিয়ে! দেশটাকে পাড়ি দিতে হয়েছে একশো বছরের ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসন আর কুড়ি বছর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় যুদ্ধ। ঔপনিবেশিকতার গভীর প্রভাব রয়েছে দৃশ্যমান বাড়িঘর, রাস্তাঘাট সব জায়গাতেই, মানুষের মনেও নিশ্চয়ই! তবে তা নিবিড় ভাবে জানার সুযোগ হয়নি! আফসোস! একশো বছরের ফরাসি শাসনের ছাপ চারদিকে খুবই দৃশ্যমান প্রশস্ত রাস্তা, গথিক শৈলীর বাড়িঘর কিংবা জানালার রাঙানো শার্শিতে। ফরাসিদের পরে আরও বিশ বছর আমেরিকার মত সুপার পাওয়ারের বিরুদ্ধে প্রবল গেরিলা যুদ্ধ করে জিতে যাওয়া যুদ্ধবিধবস্ত এই দেশটা কেমন করে এমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, পুরো ভ্রমণে সেই অভিজ্ঞতা নিজের চোখে দেখাই আমার সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়।
ঘন্টখানেকের মধ্যেই ছিমছাম একটা হোটেলে আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাইড বললো, কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে নাও তারপর আমরা বের হবো। ঢাকা থেকেই ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে পুরো ভ্রমণসূচী সাজিয়েছি নিজের পছন্দমতোই। কোথায়, কোথায় যাবো নিজেই ঠিক করেছি, সেই অনুযায়ী থাকার জায়গা আর যাতায়াতের ঝামেলাগুলো সামলানোর দায়িত্বটা চাপিয়েছি ট্যুরিস্ট কোম্পানির ঘাড়ে। এক ঘন্টার মধ্যেই নির্ধারিত একটা টুরিস্ট বাসে উঠে গেলাম। বাস ভর্তি বিভিন্ন দেশের পর্যটক, এবেলা যাদের সকলেরই গন্তব্য এক, হাজার বছরের পুরনো এই হ্যানয় শহরটার অলিগলি ঘুরে দেখা।
নতুন এক শহরের রাস্তায় চলতে থাকা মানেই বুঝি আনন্দ! অচেনা, অজানা কতকিছু দেখার যে আনন্দ তার ঠিক নেই। সবকিছুই তো নতুন, মানুষ, রাস্তা, বাড়িঘর, স্থাপনা- সব! ভ্রমণের অপরিসীম আনন্দ এখানেই। চেনা চৌহদ্দীর বাইরে গিয়ে অন্যরকম এক জীবন দেখা! সে যে কি আনন্দের!
হঠাৎই আমাদের বাস থামলো বেশ সরু ধরণের এক গলিতে, সেখানে চোখে পড়ছে বেশ কিছু খাবার দোকান-পাট, রেস্তোরাঁ, ম্যাসাজ পার্লার, মনিহারি দোকান, কি নয়! আমরা নামলাম একটা মধ্যম মানের রেস্তোরাঁয়- কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে বসলাম সেখানে রাখা টেবিলগুলোয়। আমাদের টেবিলে আরো দুজন মেয়ে এসে বসলো। কোন দেশ থেকে এসেছে জিজ্ঞাসা করাতে বললো, ভারতীয়। আমরা বাংলাদেশি শুনে কি আরেকবার ভালো করে খেয়াল করলো আমাদের? কেন জানি মনে হলো। ভিয়েতনাম ঘোরার সময়ই মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে ভারতীয়দের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেছে, কেন যেন মনে হয়েছে আগের সেই স্বাচ্ছন্দ্যটা একটু ক্ষুন্ন হয়েছে। মাত্রই ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুথ্থান ঘটে গেছে- রাজনৈতিক কারণেই দুই দেশের মধ্যে বেশ উত্তেজনাও তৈরী হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে দুই প্রতিবেশি দেশের মানুষের মধ্যে এখনো এরকম বিদ্বেষের মনোভাব দেখে আমি অন্তত ভেতরে ভেতরে চমকে গেছি এবং ভয়ানক মন খারাপের মধ্যে দিয়েও গেছি বলতেই হবে। মাঝে মাঝে বিষন্ন হয়ে ভেবেছি, কলকাতা গেলে আর কখনও কি আগেরমতো নির্ভার হয়ে ঘুরতে পারবো? হাজার বছর ধরে একই ভূখন্ডে বাস করা মানুষগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ বেনিয়ারা যে বিভেদ তৈরী করে দিয়ে গেছে তা বুঝি আর কখনই ঘোচার নয়! কিংবা হয়তো সবসময়ই অন্তরালে এই বিভেদ লুকিয়েই ছিল। জাত-পাত, ধর্ম মানুষের মঙ্গলের জন্যই নাকি তৈরী কিন্তু এগুলোর কারণেই মানুষের জীবনে যতো অমঙ্গল নেমে আসে! যাহোক, মেয়ে দুটোর সাথে খেতে খেতে আমরা অল্পবিস্তর গল্পও করলাম। কিছু অথেনটিক ভিয়েতনামী খাবার যেমন স্যুপ, নানান ধরণের লতাপাতার সালাদ সহযোগে চিকেন, নাম না জানা আরো কিছু ইত্যাদি খেয়ে শুরু হলো আমাদের পরের গন্তব্য।

৬ষ্ঠ শতকে রাজা লাই নামদের সময়ে তৈরী হ্যানয়ের বিখ্যাত ট্রান কোক প্যাগোডা বা মন্দির ছিল আমাদের প্রথম গন্তব্য যা ভিয়েতনামের প্রাচীনতম প্যাগোডা গুলোর মধ্যে অন্যতম। একটা শান্ত লেকের পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌছে গেলাম সেখানে। লেকটার নাম ওয়েস্ট লেক বা পশ্চিম লেক, ভিয়েতনামি ভাষায় ‘হো তায়’, হ্যানয় শহরের বৃহত্তম মিঠা পানির হ্রদ, যা শহরের উত্তর-পশ্চিমে তাই হো জেলায় অবস্থিত। এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখা নাকি একটা সুন্দর অভিজ্ঞতা। এখন ভর দুপুর, সূর্যাস্ত হতে এখনও অনেক বাকি, ততক্ষণে আমাদের অন্য দুটো জায়গা দেখার পরিকল্পনা রয়েছে; দেখা হবে না- কিভাবে আকাশ আর এই লেকের জলে কমলা রঙের আবীর ছড়িয়ে মন্থর গতিতে এখান থেকে বিদায় নেবেন সন্ধ্যা রবি। এই অপরূপ লেকের ধারে, কি অপরূপ হতে পারে সেই ক্ষণ, মনে মনেই সেই দৃশ্য কিছুটা কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম।
পাথরে বাধানো নকশা করা রাস্তায় চলতে চলতে লেকের পাশেই হলুদ রঙের এক দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম প্রাচীন আমলের এক তপোবনে। চারপাশে সবুজ গাছে ঘেরা, খুবই নান্দনিক মন ভালো করা এক পরিবেশ। স্থানীয় ভিয়েতনামী বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান এবং পর্যটকদের জন্যেও দর্শনীয় স্থান এই মন্দির!
ঢুকতেই চোখে পড়ে বড় এক উঠোন, চারপাশে একতলা সব টালি দেয়া বাড়ি। বাড়ি না বলে তপোবনের মধ্যে কুটির বলাই শ্রেয়, দেখলেই মনে শান্তি লাগে এমন স্থাপনা। ঢালু ছাদ মাথা নীচু করে বৌদ্ধ ধর্মের নম্রতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। পনেরোশো বছরের পুরনো বৌদ্ধ মন্দিরে বসবাসকারী বৌদ্ধ সন্নাসীরা শতশত বছর ধরে বুদ্ধের শিক্ষা দিয়ে গেছে এখানে বসে, এখনো দিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে আগরবাতির সুগন্ধে মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। দর্শনার্থীরা এখানে এসে আগরবাতি উপহার হিসেবে দিয়ে যায় আবার নিজেরাও জ্বালিয়ে স্রষ্টার কাছে মনের ইচ্ছে জানায়, সৌভাগ্যের আশায়। বেজোড় সংখ্যার আগরবাতি উপহার দেয়া হয় কারণ চীন ও ভিয়েতনামের সংস্কৃতিতে বেজোড় সংখ্যাকে সৌভাগ্য বলে মনে করা হয়। তবে কোন মাংস উপহার দেয়া হয়না যেহেতু বৌদ্ধ সন্নাসী যারা এখানে বাস করে তারা সবাই নিরামিষাশি। পুরো পরিবেশটা মনে পরম শান্তির উদ্রেক করে কিন্তু সে তো ক্ষণিকের জন্যে আমার মতো কিছু মানুষের শান্তি! শান্তি এলো কই এই অভাগী দুনিয়ায়!

গোলাপী পদ্মপাতার পাপড়ির ছবি একে গোল করে ঘেরা এক চত্বরে রয়েছে এক বিশাল বোধি ট্রি আর সেই গাছের ডালে ডালে ঝুলানো চীনা টুংটাং উইশিং বেল এ। কিছুক্ষণ পরপর বাতাস চিরে সেখান থেকে সুর ভেসে আসছে যা পরিবেশটাকে আরো বেশি অপার্থিব করে তুলেছে আর সেই সুরে মন আমার হারালো কোন সে সুদূরে, কে জানে, এক অজানা বিষন্নতাকে সঙ্গী করে! ভুটান ভ্রমণের কথা মনে পড়ে গেল, পুরো ভুটান দেশটাই এই জায়গার মতো, প্রশান্তির এক মনোরম কারখানা। ১৯৫৯ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ এদেশ ভ্রমনকালে উপহার হিসেবে ভারতের বুদ্ধগয়া থেকে, যে গাছের নীচে গৌতম বুদ্ধ বসে ধ্যান করতেন এবং বোধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সেই গাছের কাটিং এনে এখানে লাগিয়েছিলেন। দেশে দেশে সংস্কৃতির এই মিলন যখন থাকে তখনই এ বিশ্ব হয়ে ওঠে সুন্দর কিন্তু এখন আমাদের এ ধরিত্রী চলছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত লয়ে!

উঠোনের মধ্যে ঘুরে ঘুরেই আমরা মন্দিরের চারপাশ দেখতে থাকি। বৌদ্ধ ধর্মের নানান প্রতীকের মাধ্যমে পুরো জায়গাটিতেই বৌদ্ধ ধর্মের দর্শনকে স্মরণ করা হয়েছে। আটটি চাকার স্পোকের মাধ্যমে বলা হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের মহান আট পথের কথা। জায়গায় জায়গায় শুধু পদ্ম আর পদ্ম, পুরো দেশটাই যেন পদ্মফুলে মোড়ানো। মন্দিরের দেয়ালসহ সর্বত্র খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অনেক পদ্ম ফুলের নকশা যা পবিত্রতা, আধ্যাতিকতা ও জ্ঞানের প্রতীক, একই সাথে এদেশের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বেশ বড় বড় কতগুলো বনসাই গাছ রয়েছে উঠোন জুড়ে যা চারপাশ জুড়ে এক অন্য মাত্রা তৈরী করেছে; বিশাল প্রকৃতিকে যেন অল্প জায়গার মধ্যে একইভাবে ধারণ করে আছে। ড্রাগনের মূর্তিসহ নানান নকশাগুলোর মধ্যে আরো অন্তর্নিহিত অর্থ নিশ্চয়ই আছে সেগুলো সময় সুযেগ মতো জানার বিষয়। কুটিরগুলোর হলুদ রঙের দেয়াল যেন প্রাচীনকালের বা পুরানের গল্প বলার জন্য তৈরী হয়ে আছে, পুরো দেশেই এই উজ্জ্বল হলুদ রঙের ব্যবহার অন্য মাত্রার ভ্যানগগীয় ভুবন তৈরী করে রেখেছে!
একটি উচু টাওয়ার রয়েছে পাশেই যার প্রতিটি স্তরে একটা করে বুদ্ধের শ্বেত মূর্তি বসানো, দেখলেই মন প্রশান্ত হয় কিন্তু আফসোস, গৌতম বুদ্ধ আর তার যত মোঙ্গল বাণী সব এরকম সাজানোই থাকলো- বৃহত্তর মানব সমাজ এই শান্তির পথে চললো না! হাজার বছরের পুরনো এই হ্যানয় শহর জুড়েই রয়েছে এরকম প্রচুর মন্দির।
পশ্চিম হ্রদের এই মনোরম শান্ত মন্দিরের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমার মনও প্রশান্তিতে ভরে উঠলো। মনে সেই প্রশান্তির সুর নিয়েই পা বাড়ালাম পরবর্তী গন্তব্যের দিকে, এর পরের গন্তব্য একটা ঐতিহাসিক স্থান, টেম্পল অফ লিটারেচার। কিন্তু আকাশের মুখ খুবই ভার, অবস্থা দেখে মোটেও সুবিধার ঠেকছে না। গাড়িতে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো ঘন ঘোর বরিষা! বৃষ্টি যতই প্রিয় হোক না কেন, তাই বলে এই ভ্রমনকালে! শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি বিড়ম্বনা। কিন্তু তখনো বুঝিনি, এই বৃষ্টি কোন সাধারণ বৃষ্টি না, সাইক্লোন ‘ইয়াগি’ ধীরে ধীরে তার পাখনা বিস্তার শুরু করেছে! বৃষ্টির প্রথম বিড়ম্বনা হলো গাড়িতে উঠতে না উঠতেই ঠান্ডায় আরামে চোখ দুটো এমন মুদে এলো, কিসের টেম্পল অফ লিটারেচার আর কিসের কি, মনে হলো আগে নিদ্রা দেবীর সেবাটাই করে নিই কিছুক্ষণ। সেই গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ি ছেড়েছি – তারপর থেকে চলছিই। শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, বিশ্রাম চায়। কিন্তু এই আরাম যে বেড়ে পরে দুদিন ধরে চলবে- তা তো তখন বুঝিনি। এই ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অংশ ‘হালং বে’ ভ্রমণ থেকে আমাদের বঞ্চিত হতে হলো সেই দৈব দুর্বিপাকে!
আমাদের গাড়ি ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই থামলো সেই ঐতিহাসিক স্থানে যার নাম ‘টেম্পল অফ লিটারেচার’, ভিয়েতনামের প্রথম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যা কনফুসিয়াসের সম্মানে ১০৭০ সালে নির্মিত হয়। সেসময় রাজপরিবার ও অভিজাত পরিবারের সন্তানরা এখানে শিক্ষা গ্রহণ করতো। কিন্তু এমন একটা ঐতিহাসিক স্থানও এই ঘোর বৃষ্টির মধ্যে নেমে দেখার মতো শারিরীক ও মানসিক জোর পেলাম না। সামনের সিটে বসে আমি ঘুমে মোটামুটি তলিয়ে গেলেও চোখের কোনা দিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকজন ছাতা অথবা রেইন কোট নিয়েই নেমে গেল বৃষ্টির মধ্যে। যাকগে, আমার শরীরে কুলালো না, ভাবলাম বরং আধাঘন্টা রেস্ট করে পরের গন্তব্যটা দেখবো ভালো করে। বাস দাড়িয়ে থাকার পুরো সময়টা কাজে লাগলো ঘুমিয়ে। হয়তো আধাঘন্টার একটু বেশী সময় পরে গাড়ি ছাড়তেই সজাগ হয়ে তাকিয়ে দেখি যারা নেমেছিল তারা কাকভেজা হয়ে ফিরে এসে বসেছে যার যার সিটে। ভাগ্যিস নামিনি, এই বিদেশ বিঁভূউয়ে প্রথম দিনেই বৃষ্টিভেজা হয়ে কাজ নেই, জ্বর বাঁধালে পুরো ভ্রমণই কেঁচে যেতে পারে! আধা ঘন্টার ঘুম শরীর ও মনে এনেছে বেশ চনমনে ভাব।
পরের গন্তব্য আধা ঘন্টা দূরত্বের, হোয়া লো প্রিজন-Hoa Lo Prison, ফরাসি উপনিবেশবাদের অমানুষিক নিষ্ঠুরতার সাক্ষী এক বন্দীশালা, যার ফরাসি নাম মেইসন সেন্ট্রাল । প্রায় বিকেলবেলায় গিয়ে পৌঁছলাম সেখানে, আরেকটু হলেই বন্ধ হয়ে যেত সেটি।

ফ্রেঞ্চ কলোনি থাকার সময়ে (১৮৮৭-১৯৫৪), ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসকরা ১৮৯৬ সালে ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দী ও নির্যাতন করার জন্য এই কারাগার তৈরি করে। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে ছুড়ে ফেলা হতো এখানে, চলতো অমানবিক নির্যাতন।
১৯৯০ সালে বিশাল বড় কারাগারটির বেশিরভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হলেও এর মূল ফটকসহ মাত্র দুই-তিন শতাংশ টিকিয়ে রাখা অংশ নিয়ে বানানো হয়েছে এই ঐতিহাসিক জাদুঘর। ভাস্কর্য বানিয়ে দেখানো হয়েছে, কোথায়, কিভাবে বন্দিদের আটকে রাখা হতো কিংবা ফরাসি গিলোটিনে শিরচ্ছেদ করা হতো, কিভাবে দিনের পর দিন নিষ্ঠুরভাবে নির্জন কারাবাসে অমানুষিক যন্ত্রনা দিয়ে রেখে দেওয়া হতো! ভাস্কর্যগুলো সাক্ষী দিচ্ছে ভয়ংকর সে সব গল্পের, মানুষের প্রতি মানুষেরই অমানবিক অত্যাচারের যত গল্প! ঔপনিবেশিক আমলের সেসব ভয়ংকর নির্যাতনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই জাদুঘর!
Hoa- Lo- অর্থ নরকের গর্ত! বাস্তিল দুর্গের সাথে মিল রেখে ‘কলোনিয়াল বাস্তিল’ এর আরেক নাম। আমেরিকার সাথে যুদ্ধের সময় যুদ্ধবন্দীদের এত খারাপ ভাবে এখানে রাখা হতো যে বিদ্রুপ করে একে ‘হ্যানয় হিলটন’ও বলা হয়।উজ্জ্বল হলুদ রঙে রাঙানো এই বন্দীশালার দেয়ালগুলো। গেটের বাইরে ছোট ছোট লাল জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছে যার ভেতরে আঁকা হলুদ কাস্তে- সমাজতন্ত্রের প্রতীক। কালো রঙের গেট জুড়ে লেখা মেইসন সেন্ট্রাল। বাস্তবিকই, কালো ছাড়া আর কোন রঙই এই দরজার জন্য যথার্থ ছিলনা!
ঘন্টাখানেক বিষন্ন মনে ঘুরে দেখা হলো এই হোয়া লো বন্দীশালা! এ যেন যুগে যুগে, দেশে দেশে সেই আয়না ঘর, যার সাম্প্রতিক নমুনা আমরা আমাদের দেশেও দেখেছি, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। যে কোন অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার বন্ধ করতে ক্ষমতাধররা যুগে যুগে বানিয়েছে এসব আয়নাঘর! রক্ষকরাই যুগে যুগে হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের ভক্ষক- এর যেন কোন শেষ নেই!





