জহির সাদিক
তিথি বিছানায় শুয়ে আছে। জানালার ফাঁক গলে হালকা রোদের ছটা এসে পড়েছে তার বাম গালে। চোখে হালকা ঘুমের ঘোর। আর একটু হলেই হয়তো ঘুম এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে।
ঠিক তখনই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
এই ভরদুপুরে আবার কে ফোন করল?
তিথি বিরক্ত হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকালো.. মামুন!
: হ্যালো তিথী, তুই এখন কোথায়?
: এই ভরদুপুরে হোস্টেল ছাড়া আর কোথায় থাকব! বিছানায় শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছি। ফ্যান কিভাবে ঘোরে সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখছি!
: তুই কি একটু বাইরে আসতে পারবি? তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে।
: এত জরুরি কী কথা? তুই কোথায়?
: তোর হোস্টেলের সামনে.. রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।
: আচ্ছা, দশ মিনিট অপেক্ষা কর। আমি আসছি।
আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। দুপুরের অলসতা চারপাশে ছড়িয়ে আছে। বেশিরভাগ মেয়েই লাঞ্চ শেষে বিশ্রামে। বাইরে চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। সিঁড়ি বেয়ে নামতেই তিথি দেখল.. কিছুটা দূরে রোদের মধ্যে মামুন একা দাঁড়িয়ে আছে।
: এই সময়ে তোর কিসের এত ইমার্জেন্সি?
: কিছু কথা ছিল। চল, লাইব্রেরিতে বসে বলি।
: তুই পাগল নাকি? এই ড্রেসে লাইব্রেরিতে যাব না। যা বলার এখানেই বল। বরং ওই শেডের নীচে চল। ওখানে ছায়া আছে।
মামুন ধীরগতিতে তিথীর পিছে পিছে হাঁটছে।
: এবার বল, কী কথা?
মামুন কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
তিথি, অনেকদিন ধরে একটা বিষয় ভাবছিৃ তোকে কীভাবে যে বলব বুঝতে পারছি না।
: এত ভাবার কী আছে? সরাসরি বল।
: আমরা যে একজন আর একজনকে ‘তুই’ বলে ডাকিৃ এটা এখন আর শুনতে ভালো লাগে না। তুই আমাকে ‘তুমি’ করে বলবি।
কথাটা শোনার পর তিথি প্রথমে থমকে গেল। তারপর শব্দ করে হেসে উঠল।
: এই ভরদুপুরে এটাই বুঝি তোর জরুরি কথা?
: তুই এমন বাজে করে হাসছিস কেন? এতে হাসির কিছু নেই। আমি তোকে ব্যাপারটা সিরিয়াসলিই বলছি।
: আমিও তো তোর কথা সিরিয়াসলি শুনেছি। তা হঠাৎ তোর মাথায় এমন আজগুবি ভূত চাপলো কিভাবে?
: জানিনা। বেশি কিছুদিন যাবত বিষয়টি আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের অনেক বন্ধু বান্ধবীরা তো একজন আর একজনকে তুমি করে বলে। তুইও আজ থেকে তুমি করে বলবি।
তিথির হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
: আমি পারবো না।
: পারবি না মানে? আমি তো তোর কাছে কখনও কিছু চাইনি। সামান্য একটা রিকোয়েস্ট করলাম আর তুই সেটা রাখবি না?
: এটা সামান্য কিছু না, মামুন।
: তার মানে তুই পারবি না?
: তুই রেগে যাচ্ছিস কেন? এমন কিছুতো হয়নি যে রাগ করতে হবে।
: তুই পারবি না বললি কেন?
: ঠিকই বলেছি.. তোকে আমি কিছুতেই তুমি বলতে পারবো না।
মামুন চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে।
: তুই কি আর কিছু বলবি?
: না.. তুই যেতে পারিস।
তিথি আর একবারও পিছনে তাকাল না।
মামুন খেয়াল করলো তিথি একটা একটা করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। একটা সময় সে দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল।
মামুন স্থির দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন অচেনা এক কষ্ট তার পুরোটা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।
এই মুহুর্তে মামুনের আর হোস্টেলের দিকে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। সে একা রোদের মধ্যে হোস্টেলের পিছনে হাজী বেলায়েত উদ্দীন সড়ক ধরে হাঁটা শুরু করল।
মামুনের আজ খুব ইচ্ছে করছে চৈত্রের এই ভরদুপুরে তিথিকে পাশে নিয়ে হাঁটতে। প্রায় পাঁচ বছর হতে চললো এই ক্যাম্পাসে আছে অথচ এমন ইচ্ছে তার কোনদিনই হয়নি।
তিথির উপর মামুনের বেশ রাগও হচ্ছে। এতটা রাগ তার আগে কখনও হয়নি।
ওরা দু’জনেই এখন ইন্টার্নি করে। ইন্টার্নিও প্রায় শেষের দিকে। আর মাত্র দুইমাস বাকি।
মামুন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে আজ হতে তিথির সাথে সে কোন কথা বলবে না। এতদিন মামুনের ধারণা ছিল তিথি তার ভালো বন্ধু। তিথিকে সে যা বলবে তাই শুনবে। কিন্তু মামুনের ধারণা একদম ভুল। তিথির উপর তার কোন অধিকার নেই।
সপ্তাহ খানেক পর হঠাৎ একদিন মেডিসিন ওয়ার্ডে মামুনের সাথে দেখা।
: এই মামুন! তুই কি সত্যি আমার উপর রেগে আছিস?.. সরি!
মামুন কোনো উত্তর দিল না। পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
ওয়ার্ডের মধ্যে তিথি বেশ কিছুসময় ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টি তার কাছে খুব অপমান মনে হচ্ছে। মামুনের এভাবে চলে যাওয়াটা তিথির ভালো লাগেনি। অপমানটা বুকের ভেতর বিঁধে রইল। তিথি সিদ্ধান্ত নিল, আজ থেকে সে-ও আর আগ বাড়িয়ে মামুনের সাথে কোন কথা বলবে না।
এরপরের দুই মাস মামুন আর তিথির মধ্যে আর কোন যোগাযোগ হয়নি। দুজনেই দূরে সরে ছিল.. ইচ্ছে করেই।
ইন্টার্নি শেষ হবার মাস তিনেক পর মামুন একটা চাকরি নিয়ে হঠাৎ সৌদি চলে গেল। সৌদি যাবার আগে সৌজন্যতা করে হলেও সে তিথিকে কিছু বলেনি। অভিমান থেকেই হয়তো আর দেখা করার চেষ্টা করেনি!
পাঁচ বছর পর।
বছর দুয়েক হলো তিথি নিপসমে জব পেয়েছে। হঠাৎ মামুন একদিন তিথির অফিসে হাজির।
: আরে তুই? কবে এলি?
: গতরাতে।
: রায়হান ভাই কেমন আছেন?
: ভালো। কাজ নিয়েই ব্যস্ত। সারাদিন হাসপাতাল আর চেম্বার!
: তোর সংসার কেমন চলছে?
: ভালোই চলছে।
তিথি উঠে দাঁড়ালো। পাশে থাকা এক কলিগের সাথে মামুনকে পরিচয় করিয়ে দিল। ভদ্রলোক মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে কোথায় আছি কি করছি এসব জিজ্ঞেস করলেন।
তিথি ভদ্রলোক কে বললো যে সে একটু ঘন্টাখানিকের জন্য বাইরে যাচ্ছে। ভদ্রলোক খুব আন্তরিকতা নিয়ে বললেন, কোন সমস্যা নেই.. আমি আছি।
তিথি পাশে থাকা ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে মামুনকে সাথে নিয়ে সোজা নিপসমের ডক্টরস ক্যান্টিনে ঢুকলো। ওরা দু’জনে মুখোমুখি বসে আছে। আজ প্রায় পাঁচ বছর পর দুজনের মধ্যে দেখা।
: মামুন, তুই কিন্তু বেশ মুটিয়ে গেছিস।
: মোটা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক.. বউয়ের রান্না ভালো হলে এমনই হয়!
: তাইতো দেখছি.. কবে বিয়ে করলি?
: তা প্রায় এক বছর হতে চললো।
: তোর বউ দেখতে কেমন?
: অসম্ভব সুন্দর।
: তাই নাকি? তোর কাছে ছবি আছে?
মামুন তার পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে তিথির দিকে এগিয়ে দিল।
তিথি ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। একটা অচেনা মেয়ের মুখ। দেখে মনে হচ্ছে কলেজে পড়ে কিংবা ভার্সিটিতে নতুন ভর্তি হয়েছে।
: ঠিক বলেছিস.. আসলেই তোর বউ অনেক সুন্দর।
: মোবাইলে আরও আছে। দেখবি?
: না থাক.. তুই একটা কাজ কর। ওয়াশ রুমে যেয়ে চোখেমুখে পানি দিয়ে আয়। তোকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তুই কি দেশে একা আসছিস?
: হ্যাঁ, একাই আসছি..
: তোর বউ তোকে একা ছেড়ে দিল?
: আর বলিস না.. বউয়ের সাথে বুঝাপড়া খুবই চমৎকার।
মামুন ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালো।
তিথি একটা ওয়েটার কে ডেকে দুটো প্লেট দিতে বললো।
ব্যাগ থেকে খাবারের দুটো পট বের করে টেবিলের উপর রাখলো।
মামুন ফিরে এসে টেবিলের দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। সে অবাক হয়ে তার প্রিয় খাবারগুলো দেখছে। সাদা ভাত, শিং মাছের ঝোল, শুটকি মাছের ভর্তা আর গরুর ভুনা।
: এসব তুই রান্না করেছিস?
: আমি ছাড়া আর কে?
: তুই কি জানতিস আজ আমি আসবো?
তিথি মাথা নাড়লো।
: কিভাবে?
: গত পরশুদিন অসীমের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। ও বললো তুই গতকাল দেশে আসবি। তারপর কেন জানি মনে হচ্ছিল আজ তুই আমার সাথে দেখা করতে আসবি !
: একেই বলে টেলিপ্যাথি.. হাহাহা..
মামুনের হঠাৎ মনে হলো তার হাসির অন্তরালে চোখদুটো ভিজে যেতে শুরু করেছে। মামুন খুব জোর করে সেটা লুকানোর চেষ্টা করল। ইদানিং কোন কারণ ছাড়া হুটহাট করে চোখে পানি চলে আসে..!
মামুন খুব আয়েশ করে খাওয়া শুরু করল। এক এক করে সবগুলো আইটেম সে নিচ্ছে।
: তোর রান্নাটা অনেক ভালো। খুব মজা হয়েছে। এত ভালো রান্না কবে শিখলি?
: তোর বউয়ের রান্নাও তো খুব ভালো!
: শুধু রান্না না.. আমার বউয়ের সবকিছু ভালো। রূপবতী গুণবতী বলতে যা বুঝায় সব তার মধ্যে আছে। তার চুলগুলোও বিশাল লম্বা.. কেশবতী.. আরে.. আমি তো একাই খেয়ে যাচ্ছি.. তুই খাবি না?
: আমার ক্ষিধে নেই। সকালে একটু ভারী নাস্তা করেছিলাম..
তিথি মুগ্ধ হয়ে মামুনের খাওয়া দেখছে।
: আবার ফিরে যাবি কবে?
: আজকে রাতেই ফ্লাইট। আজ না গেলে বউ দুশ্চিন্তা করবে। প্রচন্ড কেয়ারিং। আমিও দুই তিনদিনের বেশি না দেখে থাকতে পারি না। হঠাৎ তোকে দেখতে ইচ্ছে হলো, তাই বউয়ের অনুমতি নিয়ে চলে এলাম.. হাহাহা..
একটু নীরবতা।
: মামুন!
: কিছু বলবি ?
: হুম! শোন, আমি অসীমের কাছ থেকে সব শুনেছি। তোকে আর জোর করে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলতে হবে না। তুই এবার সত্যি একটা বিয়ে কর।
মামুন মাথা নিচু করল। কিছুক্ষণ চুপচাপ। দুজনের কেউ কোন কথা বলছে না।
নীরবতা ভেঙে মামুন বলল,
: সেটা সম্ভব না.. তাছাড়া বিয়ের পর নতুন বউ যদি আমাকে তুই করে বলে? হাহাহা..
তিথি মৃদু হাসল, তার চোখের কোনায় মুক্তো দানার মতো পানি চিকচিক করছে।
: তুই তো সেদিন হোস্টেলে দেখা করার পর রাগ করে আমার সাথে আর কোন কথা বলিসনি.. ইচ্ছে করে যোগাযোগ রাখিসনি.. বলতে গেলে আমাকে আর কোন পাত্তাই দিসনি। তুমি বলার সুযোগও তো আর দিলি না! সৌদি যাবার আগে একটিবার অন্তত আমাকে বলতে পারতিস! আমি কিন্তু অপেক্ষায় ছিলাম! পরে ভেবেছি আমি হয়তো তোর অনুভবের কোন জায়গাতে ছিটেফোঁটাও নেই! যাহোক পিছনের ওইসব চিন্তা করে এখন আর লাভ কি ??
: তুইও তো কিছু বলিসনিৃ আমাকে একটু আভাস দিতে পারতিস!
দুজনেই চুপ।
মামুনের খুব ইচ্ছে করছে তিথির হাত দুটো ধরতে। কিন্তু সেটা আসলেই সম্ভব না। এত কাছে অথচ মনে হচ্ছে তিথি যোজন যোজন দুরে বসে আছে।
মামুন খেয়াল করল তার চোখ দুটো পানিতে টলমল করছে। দুচোখ ভর্তি জল। এভাবে ভেজা চোখে বসে থাকতে ওর খুব অস্বস্তি হচ্ছে। সে আর কোন কথা না বাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে তিথির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলো।
তিথি ক্যান্টিনের জানালা দিয়ে বাইরের পথটির দিকে তাকিয়ে আছে। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খুব ইচ্ছে করছে পিছন থেকে মামুনকে একবার ডাক দিতে। কষ্ট করে সে ইচ্ছেটা দমন করল। তাছাড়া শুধু শুধু মায়া বাড়িয়ে লাভ কি?
তিথির চোখদুটোও ভিজে আছে। আজ আর অফিসে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না।
চারপাশে এতো মানুষ.. তবুও তিথির মনে হলো সে এক বিশাল শূন্যতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে।






