যবিপ্রবিতে শিক্ষা নয়, আলোচনায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব: নিয়োগ, অনিয়ম ও প্রশাসনিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত ক্যাম্পাস; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে একাডেমিক পরিবেশ

0

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ : যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা অর্জনের পাশাপাশি বারবার আলোচনায় এসেছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার বলয়, দলীয় বিভাজন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ক্ষমতার লড়াই, বিভিন্ন গ্রুপের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এবং একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই অদৃশ্য এক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক পরিবর্তন এলেও যবিপ্রবিতে সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

এরই মধ্যে নবাগত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান ঘিরে দেখা দিয়েছে সমালোচনা। অভিযোগ রয়েছে, নতুন শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ধারিত সময়ে একাডেমিক ক্যালেন্ডার তুলে দিতে পারেনি প্রশাসন। ওরিয়েন্টেশনে পরিবেশিত খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার ইঙ্গিত বহন করে। সমালোচিত হয়েছে গভীর রাতের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও বিতর্কিত অধ্যায়

২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যশোর সদর উপজেলার সাজিয়ালী মৌজায় বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালের ২৫ জানুয়ারি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল উদ্বোধনের ওই ভিত্তিপ্রস্তর ও নামফলক অপসারণের ঘটনা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ভিত্তিপ্রস্তর ও নামফলক ভাঙচুর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন তা অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকার পর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তরটি পুনরুদ্ধার ও সংস্কার করা হয়। তবে এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিতকরণ কিংবা দায় নিরূপণে এখনও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও বিতর্কিত অধ্যায়
২০০৬ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যবিপ্রবির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন – লোকসমাজ

অভিযোগে প্রকাশ তৎকালীন উপাচার্যের গাড়ির চালক জুয়েল আহমেদ, বাস হেলপার শামীম আহমেদ ও সাহেব আলী সরাসরি এ ঘটনায় জড়িত। এছাড়া বেগম খালেদা জিয়ার রোপণ করা নিম গাছটি যাতে বেড়ে উঠতে না পারে সে জন্য তার পাশে বড় একটি বট গাছ রোপণ করার অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন এস্টেট অফিসার হাসান আলী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুন্সি মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

চব্বিশের আগস্টের পর এ অভিযুক্তরা ভীত ছিলেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ভয়ে। কিন্তু মুন্সি মনিরুজ্জামান ভিন্ন কারণে ঝিনাইদহে বদলি হলেও অভিযুক্ত সকলে এখন নিশ্চিন্তে আগের মতো বহাল তবিয়তে আছেন। কারণ তারা সকলে পরিবহন বিভাগে কর্মরত। সেখানে চব্বিশের আগস্টের পর নিযুক্ত উপাচার্য আব্দুল মজিদ প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেন পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক শিমুল ইসলামকে। যিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত শিক্ষকদের নীল দলের ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা ছিলেন। তিনি এ দায়িত্ব পেয়ে তার বন্ধু হাসান আলীকে টেনে নেন। হাসান এস্টেট বিভাগ থেকে দুর্নীতির অভিযোগে টিএসসিতে বদলি হয়েছিলেন এর আগে। সব মিলিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্বোধনী ফলক ভাঙচুর ও বিনষ্টের চেষ্টাকারীরা এক ছায়াতলে মিলিত হন।

পটপরিবর্তনের পরও কি বদলায়নি ক্ষমতার বলয়?

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল অনেকের। কিন্তু শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী একটি শিক্ষকগোষ্ঠী এখনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষক সংগঠনের কয়েকজন নেতা ও প্রভাবশালী শিক্ষক এখনও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরোনো বলয়ের প্রভাব পুরোপুরি কমেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় ৩৩০ জন শিক্ষকের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিতসংখ্যক একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী উপাচার্যের আশপাশে অবস্থান করে প্রশাসনিক প্রভাব বজায় রেখেছে। বিষয়টি ক্যাম্পাসে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা উপাচার্যকে প্রভাবিত করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখছেন। অপরদিকে সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল মজিদ এ চক্রকে দিয়ে আলোচিত গভীর রাতের নিয়োগ বাণিজ্য করেছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়টি এখন আলোচিত হচ্ছে তা হলো, পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন। তিনি সদ্য সাবেক উপাচার্য আব্দুল মজিদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু এলাকার বাসিন্দা। সে হিসেবে তিনি ড. আব্দুল মজিদের কাছের লোক হয়ে যান। তখন তিনি তার বিভাগের সহকর্মী সহযোগী অধ্যাপক শিমুল হোসেনকে সাথে নিয়ে জোটবদ্ধ হন। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষকদের নীল দলের দুই পক্ষ ছিল। এর মধ্যে একটি পক্ষ ছিল ওই সময়ের সুবিধাভোগী। গত ৫ আগস্টের পর সেই সুবিধাভোগী পক্ষ বিদায় হয়েছে। সেই সুযোগে ওই সময়ের নীল দলের উপেক্ষিত পক্ষটি এখন সক্রিয় হয়েছে। তারা চব্বিশের আগস্টের পর আসা উপাচার্য আব্দুল মজিদের কাছে যেমন কাউকে ভিড়তে দেননি, তেমনি করছেন বর্তমান ভিসি প্রফেসর ড. ইয়ারুল কবিরের ক্ষেত্রেও। যা বিস্ময় তৈরি করেছে ক্যাম্পাস জুড়ে। তিনি ২০১৯ সালে নীল দলের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন ফরম পূরণ করেছিলেন।

ড,আলাউদ্দিনের পূরণ করা নীল দলের ফরম

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে তা হলো বঙ্গবন্ধু পরিষদ নামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠনের নেতা এক কর্মকর্তা বরখাস্ত হলেও সেই সংগঠনের বিভিন্ন পদে থাকা শিক্ষকরা এখন প্রভূত ক্ষমতাশালী।

আওয়ামী লীগ সময়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ২০১৫ সালের মার্চ মাসে গঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য শিমুল ইসলাম এখন অন্যতম ক্ষমতাধর। এ বিষয়ে শনিবার শিমুল ইসলামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি সাড়া না দেওয়ায় আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুর্নীতি, অনিয়ম ও জবাবদিহির প্রশ্ন

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে পরিবহন ও ক্রয়-সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন বিভাগের ব্যয়, যানবাহন মেরামত, ক্রয় কমিটির কার্যক্রম এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন।

এছাড়া কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর অধিকাংশেরই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই অনেক বিষয় আটকে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পরিবহন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় নানা অসঙ্গতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ গাড়ি দীর্ঘ সময় ধরে মেরামতের জন্য ঢাকার একটি গ্যারেজে পড়ে রয়েছে। এ ঘটনায় বীমা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়—এমন অভিযোগও উঠেছে। তবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

এছাড়া পরিবহন বিভাগের একটি মাইক্রোবাসের মেরামত ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে পরিবহন বিভাগের জন্য ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে বিভাগটির দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ব্যয়ের পরিমাণ ৯০ লাখ টাকারও বেশি। এ নিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের উৎস ও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ক্যাম্পাসে।

ক্রয় কমিটির গঠন নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কমিটির সদস্য নির্বাচনে বৈচিত্র্য নিশ্চিত না করে অধিকাংশ সদস্য একই বিভাগের হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ কমিটির একজন সদস্য পরবর্তীতে পদত্যাগও করেন।

বিভিন্ন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত বা বিচারিক সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অধ্যাপক ড. এইচ এম জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে অতীতে এক শিক্ষার্থীর করা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। একইভাবে তার পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়েও সহকর্মীদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে শিক্ষক রাফিউল হাসানকে ঘিরেও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের দাবি, ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া শারীরিক শিক্ষা বিভাগের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আর্থিক বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের কিছু অংশ ইতোমধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের প্রত্যাশা, বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

নবাগত শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের অভিযোগ নিয়েও ক্যাম্পাসে আলোচনা হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়ী করলেও কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি।

প্রতিবেদনের জন্য শনিবার দুপুরে অধ্যাপক ড. এইচ এম জাকির হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক শিমুল ইসলাম, রাফিউল হাসান এবং ড. আলাউদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিয়োগ উৎসব

গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলেছে নিয়োগের উৎসব। যা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া না মেনেই করা হয়েছে। সদ্য সাবেক উপাচার্য আব্দুল মজিদের ধারণা ছিল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর যদি তিনি না থাকতে পারেন সে জন্য তিনি জানুয়ারি মাসব্যাপী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন। গত ১৮ জানুয়ারি ছয়টি নিয়োগ বোর্ড সম্পন্ন হয়। এরপর ২৪ জানুয়ারি এক দিনে ৬টি নিয়োগ বোর্ডেরও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধ হওয়ায় ক্যাম্পাসে লোকজন খুবই কম থাকায় প্রায় বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার গভীর রাত তথা রাত্রি ৩টা ৪টা পর্যন্ত নিয়োগ বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হতো। গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাত সাড়ে তিনটা পর্যন্ত ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের প্রভাষক নিয়োগ বোর্ড পরিচালিত হয়। এর আগের দিন ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় নানা অভিযোগ রয়েছে। ইচ্ছামতো নিয়োগ পরিচালনার জন্য বিগত উপাচার্য ইচ্ছামতো নীতিমালা পরিবর্তন ও লঙ্ঘন করেছেন।

রিজেন্ট বোর্ড গঠনেও রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। যবিপ্রবি’র আইন ২০০১ এর ১৮(১) (ঞ) ধারা অনুযায়ী একাডেমিক কাউন্সিল কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে নির্বাচিত ৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধি রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৫৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের ৫৬/৪৪ নং সিদ্ধান্তের সময় উপাচার্য তার পছন্দের ৩ জন শিক্ষককে রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য হিসেবে নির্বাচন ছাড়া মনোনয়ন দেন। একাডেমিক কাউন্সিলের অনেক সদস্য এই মনোনয়নের বিরোধিতা করেছিলেন এবং আইন অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য নির্ধারণের ব্যাপারে মতামত দেন। কিন্তু উপাচার্য তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

কী বলছেন উপাচার্য

উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর লোকসমাজকে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করছেন। বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং যেসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেগুলোও পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন, একাডেমিক কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই তার প্রধান লক্ষ্য।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানকার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা—ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, দলীয় বলয় এবং প্রশাসনিক বিতর্কের পরিবর্তে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার প্রশাসনিক প্রভাব নয়, বরং তার জ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষার পরিবেশ।