মায়ের ঘাম আর সন্তানের মেধায় দারিদ্র্য জয়, ভিটের ঠিকানায় আটকে গেল সরকারি চাকরি

0
মায়ের ঘাম আর সন্তানের মেধায় দারিদ্র্য জয়, ভিটের ঠিকানায় আটকে গেল সরকারি চাকরি
মিশন আচার্য। ছবি : সংগৃহীত

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ : বাসাবাড়িতে অন্যের থালাবাসন মেজে, মানুষের বাড়িতে কাজ করে সন্তানকে পড়িয়েছিলেন মা ময়না আচার্য। সেই মায়ের শ্রম, ত্যাগ আর নিজের মেধার জোরে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছিলেন মিশন আচার্য। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক ধাপ পেরিয়ে মেধার ভিত্তিতে প্যানেলে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

কিন্তু দীর্ঘ সংগ্রামের পর পাওয়া সেই কাঙ্ক্ষিত সরকারি চাকরিই এখন আটকে আছে একটি ঠিকানার জটিলতায়। নিজের নামে স্থায়ী জমি ও বসতঘর না থাকায় ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে এখনো নিয়োগপত্র পাননি মিশন।

জেলা থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৮২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮০ জন ইতোমধ্যে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বাকি দুজনের একজন মিশন আচার্য। চাকরির আশায় এখনো সরকারি দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি।

মায়ের শ্রমে বড় হওয়া

মিশন আচার্যের বয়স এখন ৩০ বছর। জন্মের আগেই বাবাকে হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। মিশন মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় তার বাবা নন্দ আচার্য স্ত্রী-সন্তানকে ছেড়ে চলে যান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকায় ভাড়া বাসায় ওঠেন ময়না আচার্য। সংসার চালাতে শুরু করেন মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ। অন্যের বাসনপত্র পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করে উপার্জন করা অর্থেই দুই সন্তানকে বড় করেন তিনি।

বড় ছেলে শৈলেন আচার্য সংসারের প্রয়োজনে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারেননি। তবে ছোট ছেলে মিশনের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাকে লেখাপড়া করানোর চেষ্টা চালিয়ে যান মা।

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ের মধ্যেও মিশন পড়াশোনা চালিয়ে যান। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করার পর ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

চাকরি যখন জীবনের মোড় ঘোরানোর স্বপ্ন

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে চূড়ান্ত ফলাফলে মেধার ভিত্তিতে প্যানেলে সুপারিশপ্রাপ্ত হন মিশন। এতদিনের কষ্টের পর এবার পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটবে—এমন স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি ও তার মা।

কিন্তু নিয়োগপত্র নিতে গিয়ে নতুন সংকটের মুখে পড়েন মিশন। নিজের নামে স্থায়ী জমি বা বাড়ি না থাকায় তার স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

মিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও শিক্ষাগত সনদগুলোতে ঝিনাইদহ শহরের কলাবাগান এলাকার ভাড়া বাসার ঠিকানা রয়েছে। পুলিশি তদন্তেও ওই ঠিকানার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান। তবে স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে তার নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

মিশনের ভাষ্য, সদর উপজেলার পণ্ডিতপুর গ্রামে তার মামা বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের দেওয়া দুই শতক জমি রয়েছে। কিন্তু সেখানে বসবাসের উপযোগী ঘর নির্মাণের মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই।

চাকরি হলে প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে ওই জমিতে ছোট একটি ঘর নির্মাণ করবেন—এমন স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্নই এখন নিয়োগপত্রের অপেক্ষায় আটকে আছে।

‘ভিটে নেই বলে কি যোগ্যতা হারিয়ে যায়?’

মিশনের এই পরিস্থিতির কথা জানার পর তার সহপাঠী ও বন্ধুরা বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন। মহেশপুর থেকে নিয়োগপত্র পাওয়া তার বন্ধু জিহাদ হোসেন বলেন, “যে ছেলেটি শৈশব থেকে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আজ শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে, শুধু নিজের নামে জমি বা বাড়ি নেই বলে তাকে বাদ দেওয়া সামাজিক অবিচার। আমরা বিষয়টি অধিদপ্তর পর্যন্ত নিয়ে যাব।”

মিশনের ক্ষেত্রে সংকটটি শুধু একটি চাকরির নয়; দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, মায়ের শ্রম এবং নিজের মেধা দিয়ে উঠে আসা একজন তরুণের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের বিষয়। স্থায়ী বসতভিটা না থাকার কারণে একজন যোগ্য প্রার্থী সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র থেকে বঞ্চিত হবেন কি না—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে বিষয়টি

ঝিনাইদহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “মিশন আচার্যের আবেদনটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছি। স্থায়ী ঠিকানার আইনি জটিলতার কারণে জেলা পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে পুরো বিষয়টি লিখিত আকারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি অধিদপ্তর থেকে একটি ইতিবাচক সমাধান আসবে।”

ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, “মিশন আচার্যের স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে শিক্ষা অফিসে কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি অধিদপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুত এর একটি যুক্তিযুক্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছি।”

এখন মিশন আচার্য ও তার মা ময়না আচার্যের অপেক্ষা—দারিদ্র্যের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর যে স্বপ্নের দরজায় তিনি পৌঁছেছেন, ঠিকানার জটিলতা পেরিয়ে সেই দরজাটি শেষ পর্যন্ত খুলবে কি না।