ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন বাংলাদেশে যশোরে নানা পেশার মানুষের প্রত্যাশা

গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও ন্যায়বিচার— কী ভাবছেন যশোরবাসী?

0

মাসুদ রানা বাবু, লোকসমাজ : চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নতুন সরকারের হাত ধরে দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ফিরে এসেছে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। রক্তার্জিত এই নতুন বাংলাদেশে নাগরিক অধিকার, ভেঙে পড়া অর্থনীতি, বিচার বিভাগ ও ধর্মীয় সম্প্রীতি কতটা পুনরুদ্ধার হলো, তা নিয়ে চলছে নানা মূল্যায়ন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন ও বর্তমান সরকারের পথচলা নিয়ে ‘দৈনিক লোকসমাজ’-এর মুখোমুখি হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাবনা, প্রাপ্তি ও অম্ল-মধুর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন যশোরের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ছাত্রনেতা, আইনজীবী ও ধর্মীয় প্রতিনিধি সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনকে ত্বরান্বিত করতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি দীর্ঘ সময় সীমাহীন নির্যাতন, নিপীড়নের মধ্য দিয়ে রাজপথে লড়াইটি জারি রেখেছিল। আন্দোলন দমাতে ফ্যাসিস্ট সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী করে। এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজপথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন অব্যাহত ছিল। বিএনপি সর্বপ্রথম ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক দফা ঘোষণা করে। পরবর্তী চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এক দফা ঘোষণা করা হয়। সে আন্দোলনে বিএনপি ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করতে ছাত্র-জনতাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার পাশাপাশি রাজপথে অবিচল ছিল। তার প্রতিদান স্বরূপ জনগণ গেল ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। নতুন বাংলাদেশের যাত্রার শুরুতে দেশে নতুন করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা শুরু হয়েছে। যেখানে সুষ্ঠু এবং পরিচালিত ধারার রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ তার বাকস্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। দেশের ভিন্ন মতের মানুষ নির্ভয়ে তার মতামত প্রকাশ করতে পারছে। পরমতসহিষ্ণু এবং সহাবস্থানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হয়েছে। সরকার সকলকে সাথে নিয়ে জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন আর ত্রাসের রাজত্বের কারণে দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ অচল হয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে চব্বিশের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের রেজিম পার করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে আবারও ব্যবসায়ীবান্ধব পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। দেশে বিদেশী বিনিয়োগ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারপ্রধান তারেক রহমান বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা শুনছেন এবং তার সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাছাড়া সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিতে দাঁড়িয়ে দেশ পরিচালনোর দায়িত্ব নিয়েছেন। যে কারণে সরকারের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এখন থেকে ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব রয়েছে সরকারকে সহযোগিতা করার। সকলের সহযোগিতায় সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধশালী হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন যশোর জেলা শাখার সমন্বয়ক রাশেদ খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল কুখ্যাত স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই। সে লড়াইয়ে আমরা আপাতত জয়লাভ করলেও এই গণ-অভ্যুত্থানের সুফল দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ ঘরে তুলতে পারেনি। ড. ইউনূসের ইন্টেরিম সরকারের মার্কিন প্রীতি, অসম বাণিজ্যচুক্তি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মবসন্ত্রাস, উগ্রমৌলবাদের উত্থান, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির ষড়যন্ত্র দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতিকে নেতিবাচক দিকে নিয়ে গিয়েছিল। এইসব উগ্রবাদী নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তুলনামূলক লিবারেল, ন্যাশনালিস্ট ও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপিকে দেশের জনগণ রাষ্ট্রের শাসনভার অর্পণ করেছে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তি হিসেবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন আমরা সরকারের পক্ষ থেকে দেখতে চাই। দুর্নীতি, দলীয় লেজুরবৃত্তি, টাকাপাচার, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বাকস্বাধীনতা হরণের মতো স্বৈরাচারী আচরণ আমরা এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি না। পাশাপাশি সাতচল্লিশ-একাত্তর-জুলাই, সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদের মতো বিষয়ে অযথা বাহাস বন্ধ করে দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন, জনশক্তি রপ্তানি নির্বিঘ্নকরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গরীবের নাগালের মধ্যে রাখা, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এনে দেবে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এ গফুর বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর দেশ আইনের শাসন থেকে বঞ্চিত ছিল। দেশে ন্যায়বিচার বলতে কিছু ছিল না। গুম, ক্রসফায়ার, পুলিশ কর্তৃক গায়েবি মামলা দিয়ে ভিন্ন মতের মানুষদের দমন করা হতো। আমি নিজেই একজন আইনজীবী হয়ে প্রতিদিন আদালতের বারান্দায় মানুষের অসহায়ত্বের চিত্র দেখেছি। নতুন বাংলাদেশে আগের সেই চিত্র এখন আর দেখা যায় না। গুম, ক্রসফায়ার এবং পুলিশ কর্তৃক গায়েবি মামলা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। দেশে আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জেলা ইমাম পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আবদুল মান্নান বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের জামানায় তাদের সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতনের হাত থেকে দেশের আলেম সমাজও বাদ যায়নি। আলেম সমাজ দেশের তৎকালীন বাস্তবতায় কোরআন এবং হাদিসের আলোকে সত্য ও ন্যায়ের কথা বলার পর সেটি ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে যাওয়া মাত্রই আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসতো। ফ্যাসিবাদরা যেভাবে দেশের গণতন্ত্রকে মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিল, সেখান থেকে আজ দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। বর্তমানে যারা দেশ পরিচালনা করছেন তারা মানুষের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। আজ দেশের আলেম সমাজ নির্ভয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কথা বলতে পারছেন। এখনো পর্যন্ত দ্বীনের কথা বলতে গিয়ে কোনো আলেমকে বাধা-বিঘ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। সরকারও আলেম-ওলামাদের সাথে নিয়ে দেশ গঠনে কাজ করছেন।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্ট যশোর জেলা শাখার সদস্য সচিব নির্মল কুমার বিট বলেন, গণতন্ত্র বলতে যেটা বুঝি, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারবে। সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতসহ মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। কিন্তু আমরা সেই সময় দেখেছি রাজনৈতিক কারণে মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি ধ্বংস করা হয়েছিল। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু বিবেচনা করে পুরো সমাজে বিভাজন রেখা টানা হয়েছিল। কিন্তু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দল, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ একত্রিত হয়ে ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করেছিল। ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে মানুষ সর্বক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে। আজ আমরা স্বাধীন, আজ আমরা মুক্ত, ফিরে পেয়েছি আমাদের বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার। আর তাই, ২৬-এর ১২ই ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ একটি গণতান্ত্রিক সরকার পেয়েছে। সরকারনেতা তারেক রহমান দেশের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে নিরাপত্তার চাদরে আগলে রেখেছেন। আমরা বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের শতভাগ সফলতা কামনা করি।