মাঠে পুলিশের ১৭টি টিম, তবু কমছে না মাদক: যশোরে ভয়াবহ বিস্তার

পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা, পারিবারিক সহিংসতা, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধ।

0
মাঠে পুলিশের ১৭টি টিম, তবু কমছে না মাদক: যশোরে ভয়াবহ বিস্তার

মীর মঈন হোসেন মুসা, লোকসমাজ : যশোর জেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ১৭টি বিশেষ টিম মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও বাস্তবে কমছে না মাদকের বিস্তার। বরং শহর থেকে গ্রাম—প্রতিটি স্তরে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও ভারতীয় কাশির সিরাপের বেচাকেনা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা, পারিবারিক সহিংসতা, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ—যে পরিমাণ মাদক জেলায় প্রবেশ করছে, তার সামান্য অংশই ধরা পড়ছে। ফলে মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে।

মাদকের নিরাপদ বাজারে পরিণত হচ্ছে যশোর : স্থানীয়দের অভিযোগ, যশোর শহরের প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লা এবং গ্রামের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বিক্রি। এসব স্থানে সন্ধ্যার পর অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে সড়কবাতি নিভিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে নির্বিঘ্নে চলে মাদক কেনাবেচা। বাসিন্দাদের ভাষ্য, অনেক এলাকায় মাদক কারবারিরা এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করতেও ভয় পান।

মাদকাসক্তি থেকে বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা : সাম্প্রতিক সময়ে যশোরে সংঘটিত অধিকাংশ পারিবারিক সহিংসতা, স্ত্রী নির্যাতন, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকাসক্তি অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিশেষ করে ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডল সেবনের পর অনেকেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সহিংস আচরণে জড়িয়ে পড়ছেন।

একই সঙ্গে বেড়েছে—

  • ছিনতাই
  • চুরি
  • ডাকাতি
  • কিশোর অপরাধ
  • সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড

স্থানীয়দের অভিযোগ: পুলিশের উপস্থিতি কমেছে : বিভিন্ন এলাকার মানুষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় পুলিশ কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল।

পরবর্তীতে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রশাসন কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আগের মতো নিয়মিত টহল কিংবা ওয়ার্ডভিত্তিক অভিযান আর চোখে পড়ে না।

স্থানীয়দের ভাষায়, “আগে পুলিশ টহল দিলেই মাদক ব্যবসায়ীরা গা-ঢাকা দিত। এখন তারা প্রকাশ্যেই ব্যবসা করছে।”

অনেকের অভিযোগ, কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ থাকায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

মাঠে পুলিশের ১৭টি টিম, তবু কমছে না মাদক: যশোরে ভয়াবহ বিস্তার

অভিযানে বিপুল উদ্ধার, কিন্তু সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না : গত এপ্রিল থেকে চলতি জুন মাস পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হয়েছে—

  • প্রায় ৯ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা
  • প্রায় ১৭ হাজার পিস ট্যাপেন্টাডল
  • প্রায় ১ হাজার বোতল উইনসেরেক্স ও এসকাফ কফ সিরাপ

এ সময় আটক হয়েছেন নারী-পুরুষ মিলিয়ে একাধিক মাদক বহনকারী ও কারবারি।

এক মাসেই একের পর এক বড় চালান উদ্ধার : সাম্প্রতিক অভিযানের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা—

৮ জুন

  • মনিরামপুরের বাসুদেবপুরে ২ হাজার ইয়াবাসহ এক নারী আটক।
  • সদর উপজেলার রাজারহাটে ১০৫ ইয়াবাসহ এক যুবক আটক।

৬ জুন

  • মালঞ্চীতে বাস থেকে ২ হাজার ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার।

৪ জুন

  • হামিদপুরে বাস থেকে ৩ হাজার ইয়াবা উদ্ধার।
  • একই দিনে বকচরে ২০০ বোতল এসকাফ সিরাপ উদ্ধার।

১৪ মে

  • গোয়ালদাহে সাড়ে ৪ হাজার ট্যাপেন্টাডলসহ একজন আটক।

১৩ মে

  • তফসীডাঙ্গায় ১ হাজার ইয়াবাসহ এক নারী আটক।

৩ মে

  • উপশহরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৩ হাজার ৬০০ ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার।

২ মে

  • মনোহরপুরে ৫ হাজার ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার।
  • পরে অভিযুক্তের বাড়ি থেকে আরও ১ হাজার ২০০ ট্যাবলেট উদ্ধার।

২৮ এপ্রিল

  • তফসীডাঙ্গায় ২ হাজার ইয়াবাসহ নারী আটক।

২৫ এপ্রিল

  • যবিপ্রবির পাশে ১ হাজার ২০০ ইয়াবাসহ মোটরসাইকেল আরোহী আটক।

১১ এপ্রিল

  • নতুন খয়েরতলা থেকে প্রায় ১ হাজার ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার।

মাদক আসছে দুই দিক থেকে : সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যশোরে মাদকের দুটি বড় উৎস রয়েছে।

সীমান্তপথে ভারত থেকে আসছে—

  • ট্যাপেন্টাডল
  • গাঁজা
  • উইনসেরেক্স
  • এসকাফ সিরাপ

কক্সবাজার থেকে আসছে—

  • ইয়াবা

প্রতিদিন বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে হাজার হাজার ইয়াবা যশোরে পৌঁছাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।

১৭টি বিশেষ টিম মাঠে

যশোর জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন,মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে। তিন দিন আগে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। এজন্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৭টি বিশেষ টিম কাজ করছে।

অন্যদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের পরিদর্শক নাজমুল হোসেন খান বলেন,আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে ট্যাপেন্টাডল ও ইয়াবার একাধিক বড় চালান জব্দ করা হয়েছে।

প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে

একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান, অন্যদিকে প্রতিদিনই নতুন নতুন মাদক চালান উদ্ধারের ঘটনা—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

যদি অভিযান এতটাই কার্যকর হয়, তাহলে শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কীভাবে চলছে মাদক বিক্রি?

যদি ১৭টি বিশেষ টিম মাঠে থাকে, তাহলে কেন কমছে না মাদকের সরবরাহ?

আর যদি উদ্ধার হওয়া চালানই প্রকৃত চিত্রের সামান্য অংশ হয়, তবে যশোরে মাদকের প্রকৃত বিস্তার কতটা ভয়াবহ—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।