তিনজনের পিস্তল, দুজনের শটগান — রাউজানের চৌমুহনী বাজারে দিনদুপুরে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা, সিসিটিভিতে ধরা পড়ল দৃশ্য

0
অস্ত্র হাতে তিন সন্ত্রাসী। গতকাল বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানের পাহাড়তলীর চৌমুহনী বাজারে ।। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে দিনদুপুরে অটোরিকশায় এসে পাঁচ থেকে সাতজনের একটি সশস্ত্র দল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) গুলি করে হত্যা করেছে। শনিবার বেলা দেড়টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। হত্যার পর সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে লোকজন সরিয়ে অটোরিকশায় চলে যায়। বাজারে স্থাপিত সিসি ক্যামেরায় পুরো হত্যাকাণ্ড ধরা পড়েছে।

অনুসরণ করে এসে কাছ থেকে গুলি

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, বেলা দেড়টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী এলাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চৌমুহনী বাজারে আসেন মাসুদুল। সন্ত্রাসীদের নিয়ে আরেকটি অটোরিকশা তাঁকে অনুসরণ করেই বাজারে প্রবেশ করে। মাসুদুল অটোরিকশা থেকে নেমে একটি ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই সন্ত্রাসীরা তাঁকে লক্ষ্য করে কাছ থেকে গুলি ছোড়েন। গুলিতে মাসুদুলের মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত লাগলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

মাসুদুল মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীদের তিনজন পিস্তল থেকে ও দুজন শটগান থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে শুরু করেন। ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা লোকজনকে সরে যেতে ও দোকান বন্ধ করতে বলেন। এরপর অটোরিকশায় করে রাউজানের কদলপুরের পাহাড়ি পথ দিয়ে পালিয়ে যান।

সিসিটিভিতে স্পষ্ট চেহারা, একজনের মুখে মুখোশ

বাজারে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের পুরো দৃশ্য ধরা পড়েছে। ফুটেজে দেখা যায়, সন্ত্রাসীদের মধ্যে তিনজনের হাতে পিস্তল ও দুজনের হাতে শটগান। একজনের মুখে কালো মুখোশ থাকলেও বাকিদের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ঘটনাস্থলটি রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে।

নিহতের পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

নিহত মাসুদুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁর বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। পরিবারের সদস্যরা জানান, মাসুদুল পরবর্তী নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, রাজনৈতিক বিরোধ অথবা বালু ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। রোববার ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। পুলিশ নিহতের পরিবারকে মামলা করতে থানায় আসতে বলেছে।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, হত্যায় অংশ নেওয়া তিন থেকে চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। তাদের সবাই রাউজানের বাসিন্দা। গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে খুনিদের দলীয় পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

বাজারে আতঙ্ক, দোকানপাট বন্ধ

হত্যাকাণ্ডের পরপরই চৌমুহনী বাজারের বেশিরভাগ দোকানি দোকান বন্ধ করে চলে যান। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ী আবদুল মাবুদ বলেন, “দিনদুপুরে এত গোলাগুলি আর আগে দেখিনি। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি জানান, বাজারে ৩০টির বেশি সিসি ক্যামেরা থাকার পরেও প্রকাশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

৫ আগস্টের পর রাউজানে ২৫তম হত্যা

রাউজানে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। দেড় মাস আগে একই কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলকর্মী মুহাম্মদ নাসিরকে, ঘটনাস্থল ছিল চৌমুহনী বাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে কদলপুরের শমসের পাড়ায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে রাউজানে মোট ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।