জুলুম থেকে বাঁচার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম

0

আশিকুর রহমান : মানুষের নিরাপত্তা শুধু তার জীবন রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার উপার্জন, সম্পদ, সম্মান এবং স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করে, হুমকি দিয়ে সম্পদ কেড়ে নেয় কিংবা সহিংসতার মাধ্যমে জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর অন্যায় নয়—সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার ওপরও আঘাত।

এ কারণেই ইসলাম জুলুম, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মানুষের অধিকার হরণের মতো কর্মকাণ্ড থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির পদ্ধতি ভিন্ন হলেও এর পেছনে থাকে ভয় সৃষ্টি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা।

পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি নিষিদ্ধ

মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। এমন কোনো কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে না, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় কিংবা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।

কোরআনে পৃথিবীতে ফ্যাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’

—সুরা আল-কাসাস, আয়াত ৭৭

সুতরাং মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করা, জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা কিংবা সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা ইসলামের শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ

ইসলাম মানুষের সম্পদের অধিকারকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। বৈধ ব্যবসা, শ্রমের বিনিময় কিংবা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পদ অর্জন বৈধ। কিন্তু ভয়ভীতি, হুমকি, প্রভাব, বলপ্রয়োগ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কারও কাছ থেকে অর্থ বা সম্পদ নেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না।’

—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৮৮

চাঁদাবাজি এই নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ এতে মানুষের স্বেচ্ছাসম্মতি ছাড়া ভয় বা চাপ প্রয়োগ করে অর্থ আদায় করা হয়। ফলে চাঁদাবাজি শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, ইসলামের দৃষ্টিতেও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করার শামিল।

মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা

ইসলামে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একজন মানুষ অন্যায়ভাবে অন্যের জীবন, সম্পদ কিংবা মর্যাদায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

চাঁদাবাজি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত করার পাশাপাশি অনেক সময় তার সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।

বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন ও সম্পদের মর্যাদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—‘তোমাদের রক্ত ও তোমাদের সম্পদ তোমাদের জন্য হারাম, যেমন তোমাদের এই দিন, এই মাস ও এই শহর হারাম।’

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ১২১৮

এই নির্দেশনা থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।

জুলুমের পরিণতি ভয়াবহ

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মূলে রয়েছে জুলুম। কেউ ভয় দেখিয়ে মানুষের নিরাপত্তা নষ্ট করলে যেমন জুলুম করে, তেমনি হুমকি বা প্রভাব খাটিয়ে কারও কাছ থেকে অর্থ আদায় করাও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।

জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৬৭৪১

অর্থাৎ দুনিয়ায় ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে অন্যায় সুবিধা নেওয়া সম্ভব হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়কারীদের ব্যাপারে সতর্কতা

মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ আদায়ের বিষয়টিকেও ইসলাম গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। হাদিসে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ বা শুল্ক আদায়কারীকে ‘সাহিবু মাক্স’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক তাওবাকারী নারী সাহাবির ঘটনা প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনু বুরাইদাহ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন—‘সে এমন তাওবা করেছে যে একজন মাক্স গ্রহণকারীও যদি এমন তাওবা করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হতো।’

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৩২৪

এখানে অন্যায়ভাবে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের গুরুতরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানুষের ওপর অন্যায় আর্থিক বোঝা চাপানো ইসলামের ন্যায়বিচারের আদর্শের পরিপন্থী।

মানুষের অধিকার নষ্ট করলে শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়

চাঁদাবাজি বা অন্যের সম্পদ আত্মসাতের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর হক নয়, বান্দার হকও জড়িত। কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারও অর্থ বা সম্পদ গ্রহণ করে, তাহলে শুধু মুখে তাওবা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সম্ভব হলে অন্যায়ভাবে নেওয়া সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার আদায় করতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘যদি কোনো ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি তার সম্মান বা অন্য কোনো বিষয়ে জুলুম করে থাকে, তাহলে সে যেন আজই তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়।’

—সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৯

এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অন্যায়ভাবে অর্জিত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাওয়া তাওবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে জুলুম প্রতিরোধ জরুরি

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম কোনো সুস্থ সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এসব অপরাধ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নষ্ট করে, অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় আঘাত করে এবং সমাজে ভয়, অবিশ্বাস ও অস্থিরতা বাড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও।

ইসলাম তাই শুধু ব্যক্তিকে অন্যায় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়নি; বরং মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

একটি শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি হলো ন্যায়, সততা, আমানতদারি, পারস্পরিক সম্মান এবং মানুষের অধিকার রক্ষা। ব্যক্তি ও সমাজ যদি এই মূল্যবোধগুলো ধারণ করতে পারে, তাহলে জুলুম, ভয়ভীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি শক্ত নৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

ইসলামের শিক্ষা তাই স্পষ্ট—নিজে জুলুম করা যাবে না, জুলুমের শিকার মানুষকে অসহায় রেখে দেওয়া যাবে না এবং অন্যের অধিকার হরণ করে অর্জিত সম্পদকে বৈধ মনে করারও সুযোগ নেই। মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করাই ন্যায়ভিত্তিক সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত।