এল নিনোর প্রভাবে বদলাচ্ছে শীতের চরিত্র: দেশে এবার দেরিতে আসতে পারে ঠান্ডা, কমবে ব্যাপ্তি ও তীব্রতা

0
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে চলতি মৌসুমে দেশে শীত দেরিতে আসতে পারে। গড় তাপমাত্রা বেশি থাকায় কমে যাবে শীতের আয়ু ও তীব্রতা, তবে বাড়তে পারে ঘন কুয়াশা ও কৃষির ঝুঁকি।। ছবি: সংগৃহীত

এল নিনোর প্রভাবে চলতি শীত মৌসুমে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে এবং শীত আসতে কিছুটা দেরি হতে পারে। শুধু তাই নয়, এবার শীতের আয়ুও কম হতে পারে এবং গত কয়েক বছরের তুলনায় এর তীব্রতাও কম থাকার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, শক্তিশালী এল নিনোর সরাসরি প্রভাবে চলতি শীত মৌসুমে দেশের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের সম্ভাবনা বেশ কম। তবে এই সময়ে বৃষ্টিপাত কম হলে ঘন কুয়াশার প্রকোপ অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।

আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের আগাম আভাস ইতোমধ্যে মিলতে শুরু করেছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। সেখানে মধ্যরাতের পর ঠান্ডার অনুভূতি কিছুটা বাড়ছে এবং ভোরে দেখা যাচ্ছে কুয়াশা ও শিশির। তবে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় এখনও শীতের আমেজ তেমন একটা অনুভূত হচ্ছে না। বরং দিনের বেলা অনেক জায়গায় এখনও ভ্যাপসা গরম রয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আজ শুক্রবারের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে বর্ষার আনুষ্ঠানিক বিদায় ঘটবে। কিন্তু মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পরপরই হুট করে শীত নেমে আসবে, এমনটা নয়। অক্টোবরজুড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন অত্যন্ত ধীরে ধীরে ঘটতে পারে এবং নভেম্বরের শেষভাগ থেকে শীতের অনুভূতি আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষে জানা যায়, এবার এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকবে এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। ফলে এবার শীতের মেয়াদ কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শীতের সময় কম হলেও ঘন কুয়াশা বাড়তে পারে এবং এরই মধ্যে নদী অববাহিকা অঞ্চলে কুয়াশা পড়তে শুরু করেছে।

বদলাচ্ছে শীতের চরিত্র

এবারের শীতের চরিত্র মূলত বদলে যেতে পারে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে। প্রশান্ত মহাসাগরের এই প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়ার প্রভাব সরাসরি বাংলাদেশে না পড়লেও বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে এর প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছাতে পারে।

গত জুনের পর থেকেই এল নিনোর শক্তিশালী অবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, বরং পুরো ভারতীয় অঞ্চলে পড়তে পারে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মে অনিয়মিত বৃষ্টি ও স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে। আবার শীতেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের পূর্বাভাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকার ইঙ্গিত রয়েছে এবং একই সময়ে বৃষ্টিও কম হতে পারে। কয়েক দফায় শৈত্যপ্রবাহ হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশে শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত স্থানভেদে ১২ থেকে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এবং উত্তরাঞ্চলে তা ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রিতে নেমে আসতে পারে। তবে এবার গড় তাপমাত্রা ১৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। একটানা দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পরিবর্তে স্বল্পস্থায়ী ও বিচ্ছিন্ন শৈত্যপ্রবাহ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শৈত্যপ্রবাহের দিনসংখ্যা কম হলেও কোনো কোনো সময়ে তীব্র ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে।

উত্তরাঞ্চলে রাতে পরিষ্কার আকাশ, হালকা বাতাস ও কুয়াশার পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র শীতের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

সাধারণত বাংলাদেশে অক্টোবরের শেষ দিক থেকে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং নভেম্বরের শেষভাগে উত্তরের হিমেল বাতাসের প্রভাব বাড়ে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকে শীতের মূল সময়। তবে এবারের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অক্টোবরজুড়ে দিনের বেলা গরম থাকার পর ধীরে ধীরে দেশের আবহাওয়া শীতের দিকে এগোতে পারে।

শীত কমার দীর্ঘমেয়াদি ইঙ্গিত

বর্তমান শীতের পূর্বাভাসের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতাও হুবহু মিলে যাচ্ছে। নরওয়ের মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদন ‘দ্য ফিউচার ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’-এ ভবিষ্যতে দেশে শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

উক্ত গবেষণায় ১৯৮৫-২০১৪ সময়কে ঐতিহাসিক ভিত্তি ধরে ২০৪১-২০৭০ এবং ২০৭১-২১০০ সময়ের সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতি বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, চলতি শতাব্দীর শেষে শীতকালে দেশের দৈনিক গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

কৃষিতেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব

শীতের আয়ু ও তীব্রতা কমে গেলে দেশের কৃষি খাতেও এর কিছু ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। শীতকালীন অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত ফলনের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঠান্ডার প্রয়োজন হয়। তাপমাত্রা বেশি থাকলে কিছু ফসলের চাষের সময়সূচি ও ফলনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

অন্যদিকে, বৃষ্টি কমে গেলে মাটির আর্দ্রতা কমে যেতে পারে, যা শীতকালীন ফসল এবং পরবর্তী বোরো ধানে সেচের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার বৃষ্টি কম হলেও ঘন কুয়াশা হলে শীতকালীন সবজি, আলুসহ কিছু ফসলে নানা রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে কোন ফসলে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল, তাপমাত্রা, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত ও কুয়াশার স্থায়িত্বের ওপর।

শীতের ব্যাপ্তি কমে যাওয়ায় কৃষিতে কী প্রভাব পড়ছে সে বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মঞ্জুরুল কাদির বলেন, প্রতিটি ফসলের একটা নির্ধারিত তাপমাত্রার স্তর থাকে। শীতকালীন ফসলগুলোর (যেমন আলু, গম, ভুট্টা, সরিষা, টমেটো প্রভৃতি) জন্য তাপমাত্রা ১০ থেকে ১২ বা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে টানা প্রায় আড়াই মাস থাকতে হয়। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে সব ফসলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন কমে আসবে।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে গেলে ফসলটি দ্রুত পরিণত হয়ে যায়, যার ফলে এর স্বাভাবিক ফলন কমে যায় এবং কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে কৃষক ওই ফসলের আবাদ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে, আর এই কারণটির জন্যই বর্তমানে দেশে গমের উৎপাদন অনেকটাই কমে গেছে।

দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো

আগামী ডিসেম্বরে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি বলছে, এবার ১৯৫০ সালের পর রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে এটি।

ডব্লিউএমওর মাসিক ‘গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় রেকর্ড পরিমাণ বাড়তে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, এল নিনো ইতোমধ্যে তার শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে এবং তা অত্যন্ত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রায় ১০০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে এ অবস্থা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে বজায় থাকবে।

উল্লেখযোগ্য যে, এল নিনোর প্রধান কেন্দ্র হলো মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর। এ অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে পুরো বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে বড় পরিবর্তন আসে। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এই এল নিনো দেখা দেয় এবং তা ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

ডব্লিউএমওর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। আর যদি এমনটি ঘটে, তবে তা হবে আবহাওয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ।