পাখির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে ঝিনাইদহের মানুষের

0
ছবি: সংগৃহীত।

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহ ॥ ভোরের সূর্য ওঠার আগেই কিচিরমিচির শব্দে এখন ঝিনাইদহের মানুষের ঘুম ভাঙে। শুধু ভোর নয়; সকাল, দুপুর কিংবা নিঝুম রাতেও ডানা ঝাপটানো হরেক প্রজাতির পাখির ডাকে মুখরিত হয় জনপদ।

ঝিনাইদহের সাবেক জেলা বন কর্মকর্তা গিয়াস উদ্দীন মুকুল জানান, এক সময় শিকারীদের উপদ্রব আর বন-জঙ্গল উজাড় হওয়ার কারণে অনেক পাখির প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ, পুলিশের নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে চিত্রটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তিনি বলেন, গ্রামের ঝোপঝাড়, পুকুরপাড় আর পুরনো গাছগুলোতে এখন নির্ভয়ে বংশ বিস্তার করছে হাজারো প্রজাতির পাখি। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে গেলে দোয়েল, চড়ুই, শালিক, বুলবুলি, টুনটুনি ঘুঘু, হরিয়াল, বক,

শামখোল, গাংচিল, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ডাহুক, কোকিল, ফিঙে, শ্যামা, হলুদ পাখি (বেনেবউ), কাঠঠোকরা, লক্ষ্মীপেঁচা ও হুতুমপেঁচা চোখে পড়ে। বিশেষ করে বিল ও নদীবেষ্টিত গ্রামগুলোতে জলচর পাখিদের দীর্ঘ লাইন আর ডানা মেলার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

ঝিনাইদহ জেলা পশু সম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আতিকুজ্জামান জানান, কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে পাখিদের এই অবাধ বিচরণ কেবল প্রকৃতির ভারসাম্যই রক্ষা করছে না, বরং গ্রামীণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। সাতসকালে দোয়েলের শিষ কিংবা দুপুরে ঘুঘুর ডাক মানুষের ক্লান্ত মনে প্রশান্তি জোগায়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে পাখির কলতান এক ধরনের ‘ন্যাচারাল থেরাপি’ হিসেবে কাজ করছে, যা মানুষের মন ও মননে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা তৈরি করে।

তিনি জানান, ২০০৩. ২০০৫, ২০১২ সালের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ আইনটি কার্যকর হওয়ার পর থেকে পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে এখন পাখি শিকারি দেখলেই স্থানীয়রা বাধা দিচ্ছেন, যা পাখিদের বংশ বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

ঝিনাইদহের পরিবেশবিদ জহির রায়হান জানান, গ্রামগুলোকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পাখি গ্রাম’ বা অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশের এই জীববৈচিত্র পৃথিবীর মানচিত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জীববৈচিত্র্য আইনের কঠোর প্রয়োগ ও পাখি শিকার নিষিদ্ধকরণের ফলে গত দুই দশকে গ্রামবাংলার নিসর্গ ফিরে পেয়েছে তার হারানো জৌলুস। এখন গ্রামের ঝোপঝাড়, হিজল-তমালের শাখা আর বিস্তীর্ণ বিলের পানিতে ডানা ঝাপটায় নাম না জানা শ’শ প্রজাতির পাখি, যাদের অবাধ বংশবিস্তার নিস্তরঙ্গ পল্লীজীবনকে করে তুলেছে প্রাণচঞ্চল।

মিনারা নামে এক গৃহবধূ জানান, তিনি প্রায়ই শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে যান। নিসর্গের এই সুরভিত প্রত্যাবর্তন আর বিহঙ্গকুলের এই বৈচিত্রময়তা সংসার জীবনের প্রতিটি বাঁকে যে প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা আধুনিক সভ্যতার কোলাহলের মাঝে এক পশলা বৃষ্টির মতোই স্নিগ্ধ ও সঞ্জীবনী।