যশোরে সবুজের সমারোহে দুলছে কৃষকের স্বপ্ন, বোরোর বাম্পার ফলনের হাতছানি

0
ছবি: সংগৃহীত।

মাসুদ রানা বাবু ॥ যশোরের দিগন্তবিস্তৃত মাঠজুড়ে এখন শুধু সবুজের মায়াবী হাতছানি। বসন্তের দখিনা বাতাসে দুলছে কচি ধানের ডগা, আর সেই দোলায় লুকিয়ে আছে হাজারো কৃষকের রঙিন স্বপ্ন। চৈত্রের তপ্ত দুপুরে মাঠ জুড়ানো সবুজ ধানক্ষেতের সেই সতেজ ঘ্রাণ আর ঢেউ খেলানো দৃশ্য জানান দিচ্ছে, এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন কেবল সময়ের ব্যাপার।

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও নিরবচ্ছিন্ন সেচ দিতে পারায় মাঠে মাঠে বোরো ধানক্ষেতে এমন সবুজের সমারোহ ঘটেছে।

কৃষকরা বলছেন, এবারের বোরো মৌসুমে এখনো পর্যন্ত সেচ নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং চাহিদামতো ডিজেল প্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ায় তারা বোরো ক্ষেতে প্রয়োজনমতো সেচ দিতে পারছেন। কৃষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের ওপর তাদের সেচ কাজ নির্ভরশীল। বোরো ধান উৎপাদনের সাথে জড়িত শক্তিশালী এই দুটি উপকরণ নিরবচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের কোনো দুশ্চিন্তার কারণ হয়নি।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার আটটি উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। যা গত মৌসুমের তুলনায় ৮৫০ হেক্টর বেশি। গত মৌসুমে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছিল।

একদিকে চলছে বৈশ্বিক সংকট, অন্যদিকে এবার গতবারের চেয়ে ৮৫০ হেক্টর বেশি জমিতে বোরো ধানের আবাদ হলেও সেচ নিয়ে কৃষকের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। বিগত মৌসুমগুলোর চেয়ে এবার কৃষক পর্যাপ্ত বিদ্যুৎসেবা পাচ্ছেন। আবার যেখানে ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর সেচ নির্ভর, সেখানে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং ডিজেলের সমন্বয়ে কৃষক সুবিধা মতো বোরো ধানে সেচ দিতে পারছেন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষকদের বোরো ক্ষেতের সেচ নিয়ে যেন কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে না হয়, তার প্রতিশ্রুতি দেয়। সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও নিজ জেলায় বিভিন্ন কর্মসূচিতে বলেন, কৃষকদের স্বার্থে কোনো আপস করা হবে না।

বোরো মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, যাতে করে কৃষকরা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সরকার দায়িত্ব লাভের পর রমজান মাস শুরু হয়, সেই সাথে বৈশ্বিক সংকটও ছিল। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।

যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন রিপন বলেন, ‘বিদ্যুৎ নিয়ে এবারের বোরো মৌসুমে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আলহামদুলিল্লাহ, চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ পাচ্ছি। বিগত বছরগুলোতে বোরো ধানের শেষ মুহূর্তে বিশেষ করে খরা শুরুর সাথে সাথে দুশ্চিন্তায় থাকতাম। চলতি মৌসুমে এখনো পর্যন্ত যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তাতে আমরা আশাবাদী যে মৌসুমের শেষ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা পাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো রাতে বিদ্যুৎ বেশি পাচ্ছি। দিনের বেলা প্রখর রোদ থাকে, এ সময় একটানা দীর্ঘ সময় মোটর চালালে পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাতে একটানা দীর্ঘ সময় মোটর চালাচ্ছি, কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া গ্রামের কৃষক মশিউর রহমান বলেন, ‘এবার ১০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। এর মধ্যে সাত বিঘা জমি বিদ্যুৎচালিত পাম্পের ওপর এবং তিন বিঘা জমির সেচ ডিজেলচালিত মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ এবং ডিজেল কোনোটার ঘাটতি না হওয়ায় আমার সেচ কাজে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়ন নিয়ে পাম্পে গেলে চাহিদামতো ডিজেল পেয়ে যাচ্ছি।’

যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সংকটের মধ্যেও এবার সরকারের আন্তরিকতায় আমরা কৃষককে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা দিতে পারছি। যে কারণে এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে কৃষক পর্যায়ে কোনো ধরনের অভিযোগ আসেনি। এখনো পর্যন্ত যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, আশা করছি শেষ পর্যন্ত সেটি অব্যাহত থাকবে এবং সুষ্ঠুভাবে বোরো মৌসুম সম্পন্ন হবে।’

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘বোরো ধানের সেচ নিয়ে আমাদের কাছে এখনো পর্যন্ত কোনো কৃষক অভিযোগ করেনি। চাহিদামতো বিদ্যুতের পাশাপাশি ডিজেল পাওয়ায় বোরো ধানে সেচে কৃষকদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।

কৃষকরা যাতে চাহিদামতো ডিজেল পায় তার জন্য ১৭৫ জন তদারকি করছে। খুব সুন্দরভাবে কৃষক সেচ কাজ সম্পন্ন করতে পারছে, যে কারণে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হবে ইনশা আল্লাহ।’