যশোরে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তনের শুনানিতে আবেদনকারীরাই অনুপস্থিত

খারিজের প্রত্যাশা রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের দুটি আসনের সীমানা পরিবর্তন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে দুই ব্যক্তির আবেদনের শুনানিতে আবেদনকারীরাই অনুপস্থিত ছিলেন। এসময় একতরফাভাবে শুনানি করেছে কমিশন। এ আবেদন নিয়ে গত কয়েক দিন উত্তপ্ত ছিল যশোর। বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী আলাদাভাবে মিছিল, সমাবেশ ও নির্বাচন কমিশন বরাবর স্মারকলিপি পেশ করে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। দুই আবেদনকারীর অনুপস্থিতি এবং প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে জোরালো আইনি ও যৌক্তিক অবস্থান

তুলে ধরায় আবেদন দুটি খারিজ হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন যশোরের বিএনপি নেতারা।

বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডলের আবেদনে যশোর-৪ আসন থেকে (মণিরামপুর) থেকে ছয়টি ইউনিয়ন এবং যশোর-৬ (কেশবপুর) থেকে তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে একটি নতুন যশোর-৬ আসন গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এবং বসুন্দিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. নুরুজ্জামানের আবেদনে যশোর-৪ আসন থেকে বসুন্দিয়া ইউনিয়নকে সম্পূর্ণভাবে যশোর-৩ (সদর) আসনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

গতকাল বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না এবং তার পক্ষে কথা

বলার জন্যও কেউ ছিলেন না। যদিও তার ঘনিষ্ঠ সূত্র দাবি করেছে, তিনি নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ায় শুনানিতে অংশ নিতে পারেননি এবং তার পক্ষে লিখিত বক্তব্য জমা দেওয়া হয়েছে। তবে শুনানিতে উপস্থিত যশোরের শত শত বিএনপি নেতা-কর্মী জানান, তারা তাকে সেখানে দেখেননি।

একইভাবে বসুন্দিয়া ইউনিয়নের আবেদনকারী অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামানও অনুপস্থিত ছিলেন। তবে তার পক্ষে একজন প্রতিনিধি কথা বলার সুযোগ পান। আবেদনকারীদের এমন অনুপস্থিতিকে আইনিভাবে আবেদনের দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন বিরোধী পক্ষ।

যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, “আইন অনুসারে, বাদী উপস্থিত না থাকলে আবেদন খারিজ হয়ে যায়। সিইসি বারবার আবেদনকারীর পক্ষে কথা বলার জন্য আহ্বান জানালেও কেউ সাড়া দেননি। আমরা আশা করছি, এই অযৌক্তিক আবেদনগুলো খারিজ হবে।”

আবেদনগুলোর বিপক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নূরে আলম সিদ্দিকী সোহাগ জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন।

নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘বসুন্দিয়া ইউনিয়নটি যশোর-৪ আসনের বাঘারপাড়া ও অভয়নগর উপজেলার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করে। একে বিচ্ছিন্ন করে সদর আসনের সাথে যুক্ত করলে বাঘারপাড়া উপজেলা পুরোপু-রি একা হয়ে পড়বে এবং আসনের ভৌগোলিক অখন্ডতা নষ্ট হবে।’

আইনজীবীরা বলেন, তিনটি আসন ভেঙে একটি নতুন আসন গঠনের প্রস্তাবটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এতে প্রতিষ্ঠিত আসনগুলোর প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।

শুনানিতে যশোরের দীর্ঘদিনের দুঃখ ‘ভবদহ’ সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়। আইনজীবীরা প্রস্তাব দেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পুরো আসন ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন নেই। বরং শুধুমাত্র ভবদহ-কবলিত অঞ্চলগুলোকে উন্নয়নের স্বার্থে যেকোনো একটি আসনের (যশোর-৪, ৫ বা ৬) অধীনে আনা যেতে পারে। এতে একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে সমন্বিতভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে। কমিশন এই যুক্তিগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনে লিপিবদ্ধ করেছে বলে জানা গেছে।

শুনানিকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি গোলাম রেজা দুলু, দৈনিক লোকসমাজের প্রকাশক শান্তনু ইসলাম সুমিত, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম, নগর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম চৌধুরী মুল্লুক চাঁদ, বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক ও যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু প্রমুখ।

উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর যশোর-৩ ও যশোর-৬ আসনের সীমানা পরিবর্তনের লিখিত আবেদন করেন। এছাড়া অ্যাডভোকেট মো. নুরুজ্জামান পুরো বসুন্দিয়া ইউনিয়নকে যশোর সদরে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আবেদন করেন। এ আবেদনের শুনানির দিন গতকাল নির্ধারণ করেছিল নির্বাচন কমিশন। শুনানিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সামনে হাজির হন যশোরের শ’শ’ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।এসময় তারা মানববন্ধন ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।

তাদের অভিযোগ জনমতকে গুরুত্ব না দিয়ে দুই ব্যক্তি নিজেদের মতো করে নির্বাচন কমিশনে সীমানা পরিবর্তনের আবেদন করে। এটাকে চক্রান্ত অভিহিত করে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা এটি।