বিনোদনে মোবাইল ফোন নয়, বই পড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ জেলা প্রশাসনের

0

তহীদ মনি ॥ এবার ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছেন যশোর জেলা প্রশাসন। কালেক্টরেট পুকুরপাড়ের নান্দনিক ও মনোরম পরিবেশে সময় কাটাতে আসা দর্শনার্থীদের হাতে বই তুলে দিতে স্থাপন করা হচ্ছে উন্মুক্ত পাঠাগার। উদ্দেশ্য-যারা বিনোদনের জন্য আসেন, তারা যেন মোবাইল ফোসে মুখ গুজে না রেখে অন্তত একটা বইয়ের নাম জানতে পারেন, প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা হলেও হলেও বই পড়েন।

এই ভাবনা থেকেই যশোরের কালেক্টরেট পুকুরপাড়ে এই উন্মুক্ত পাঠাগার স্থাপন করছেন জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলাম। শুধু তা-ই নয়, পাঠাগারেরর পাশেই থাকছে একটি খাবারের দোকান বা ফুড কোর্ট। সেখান থেকে বই না পড়লে বা বই ইস্যু না করালে কেউ কিছুই কিনতে পারবেন না। পাঠাগারেরর জন্য প্রথম দফায় যুক্ত হচ্ছে প্রায় আড়াইশ বই। আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে এ উন্মুুক্ত পাঠাগারের।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঐতিহ্যমন্ডিত যশোর কালেক্টরেট ভবন একটি দর্শনীয় সুপ্রাচীন দফতর।

এক সময়ের হাজার দুয়ারি নামে পরিচিত ভবনটি দর্শনীয়ও বটে। এ ভবন দেখতে নানা বয়সের মানুষ এখানে আসেন। এ দফতরের আঙিনায় বর্তমানে যে সুন্দর পুকুরটি রয়েছে, কয়েক বছর আগেও তা ছিল আবর্জনার স্তূপ ও জঙ্গলে ভরা।

বিগত সময়ের কয়েকজন জেলা প্রশাসক পর্যায়ক্রমে এটির সংস্কার করে আধুনিক রূপ দিয়েছেন। ঘাট বাঁধানো, রঙিন মাছ ছাড়া, পাড় বাঁধানো, দর্শনার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য বেঞ্চ বসানো, এমনকি শহুরে জীবনে পদ্ম ফুল দেখতে অনভ্যস্ত মানুষকে পদ্মগাছ চেনানোর সুযোগ হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী এখানে আসে সময় কাটাতে।

অভিভাবকরাও আসেন শিশুদের রঙিন মাছ, পদ্মফুল দেখাতে বা শহুরে জীবনের ক্লান্তি কাটাতে খোলা হাওয়া ও প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে। সম্প্রতি বর্তমান জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে পুকুরে ছোট নৌকা নামানো হয়েছে; দর্শনার্থীরা অর্থের বিনিময়ে নৌকায় চড়ে বিনোদন নিতে পারছেন, পদ্ম গাছ ও ফুল ছুঁয়ে দেখতে পারছেন।

এত আয়োজনের পরেও থেমে নেই জেলা প্রশাসন। এবার পুকুরপাড়ে (ঘাট থেকে উঠতে ডান পাশে) তৈরি হচ্ছে সবার জন্য উন্মুক্ত এই পাঠাগার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এটি খোলা থাকবে। এটি দেখভাল ও বই লেনদেনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন। পাঠাগারে থাকবে বিভিন্ন ধরনের বই।

এখানে আসা যেকোনো দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা সাধারণ মানুষ ইচ্ছে হলেই যে কোনো বই পড়তে পারবেন। জেলা প্রশাসনের ভাবনা হলো, কোনো দর্শনার্থী বা শিক্ষার্থী অন্তত মিনিট পাঁচেক একটি বই নেড়েচেড়ে দেখলেও বা দিনে অন্তত একটি বইয়ের নাম জানলেও সেটি বই চেনা ও পাঠ্যঅভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। বেঞ্চে বসে শুধু মোবাইল ফোন দেখে বা সময় নষ্ট না করে যদি কিছুটা সময় বইয়ের জন্য বা পড়াশোনায় ব্যয় করা যায়, তবেই এই আয়োজন সার্থক হবে।

এই পাঠাভ্যাস আন্দোলনকে আরো উৎসাহিত করতে পাঠাগারের পাশেই থাকছে চা, কফি, পিঠাসহ হালকা খাবারের ব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য তৈরি হচ্ছে দোকান। তবে শর্ত হলো- বই না পড়লে বা বই না নিলে কেউ খাবার কিনতে পারবেন না।

গত মঙ্গলবার দুপুরে পুকুরপাড়ে ঘুরতে আসা যশোর বিএএফ শাহীন কলেজের সাবেক ছাত্র নিশাত, শামীম এবং আব্দুর রাজ্জাক কলেজের শিক্ষার্থীরা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে নিশ্চিতভাবেই কিছু মানুষ বই পড়তে আগ্রহী হবে, কিছু সময়ের জন্য হলেও বই নিয়ে সময় কাটাবে। একই রকম কথা বলেন যশোর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রাফিন, তানিয়া এবং নিশিতা। তাদের মতে, এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মোবাইলে সময় কাটালেও বই পড়ার এমন সুযোগ পেলে নিশ্চয়ই কিছু সময় সেখানে ব্যয় করবে। জেলা প্রশাসনের এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন যদি সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে অবশ্যই সুফল মিলবে।

যশোর জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি মনে করি না রাতারাতি সবাই বইমুখী হবে। এটা একটি প্রচেষ্টা। আমাদের এই উদ্যোগের ফলে যদি কেউ অন্তত একটি বই নেড়েচেড়ে দেখে, তাতেও বইয়ের প্রতি তার আগ্রহ জন্মাবে। এমন চমৎকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে, বেঞ্চে বসে খোলা বাতাসে প্রকৃতির খুব কাছে থেকে বই পড়ার অভিজ্ঞতা নেওয়াটা আকর্ষণীয় হবে।’